Atheist in Bangladesh

ধর্ম নিয়ে ব্যবসা!

মিরপুরের মাজার– ঢাকাবাসীর কাছে পরিচিত একটি নাম মিরপুরের হযরত শাহ্‌ আলীর (র.) মাজার। এই মাজার নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। মিরপুর ১নং বাস-স্ট্যান্ড থেকে পশ্চিম দিকে হেঁটে তিন থেকে চার মিনিটের পথ। প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে এখানে বসে গানের আসর। বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের সুর ও গানে মাতিয়ে রাখা হয় পুরো রাত। বিভিন্ন স্থান থেকে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোক এখানে আসেন গান শুনতে। আসরে লোকসংখ্যার ধারণা দিতে গেলে বলতে হয়, মাজারের বিপরীত পাশে খাবার ঘর’ নামের হোটেলে প্রতি বৃহস্পতিবার ২০০-২৫০ জার পানি বিক্রি হয়, যা অন্যদিনের তুলনায় ২৫-৩০ গুণ বেশি।
সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রথম দেখায় মনে হয়, তারা মাজারে আসা সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছে। পাশে কয়েকজন চায়ের ফ্লাস্ক নিয়ে বসে আছে। তারা চা খাওয়ার জন্য ডাকে। ভাবলাম, বাহ্ স্বাগত জানানোর পর আপ্যায়নেরও ব্যবস্থা! তাদের পাশেই স্থায়ী চায়ের দোকান, সেখানে চা খাওয়ার জন্য দাঁড়াই। শোনার চেষ্টা করি ওই তরুণী-কিশোরীদের কথাবার্তা। নিচু স্বরে কথা বলছে তারা। কিছুক্ষণের মধ্যে বুঝতে পারি ওরা ৪০০-৫০০ টাকার বিনিময়ে পুরুষের সঙ্গে রাত কাটানোর কন্ট্রাক্ট করছে। মজার বিষয় হলো, ওই স্থান থেকে মাত্র ২০-২৫ গজ দূরে ছিল পুলিশের গাড়ি। পুলিশ এ সব দেখেও না দেখার ভান করে।
শাহ্‌ আলী থানার এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, বিভিন্ন সময়ে এদের আটক করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া মদ-গাঁজাসহ প্রতিদিনই কাউকে না কাউকে আটক করা হয়। এরা জামিনে বেরিয়ে এসে আবার একই কাজ করে।’ স্থানীয় এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ওরা পুলিশকে টাকা দেয়, তাই পুলিশ ওদের ধরে না।’
ছদ্মবেশী চা বিক্রেতা তরুণী-কিশোরীদের প্রসঙ্গে তাজুল ইসলাম নামে স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বলেন, কিছুদিন আগে আমি চা খেয়ে ১০০ টাকার নোট দিলে আমাকে বাকি টাকা ফিরিয়ে না দিয়ে মোবাইলে বেলেট বাবু, ছিল্লা বাবুল, ফরমা জসিমসহ কয়েকজনকে ডেকে এনে বলে- আমি তাকে কু-প্রস্তাব দিয়েছি। ওরা আমাকে মারতে উদ্যত আমি ভয়ে চলে যাই।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক ব্যবসায়ী জানান, এখানে খলিল ওরফে গাঁজা বাবা নামে একজন আছেন, যার হাতে সালামি দিলে, বিনিময়ে কৌশলে গাঁজার পুরিয়া হাতে ধরিয়ে দেন।
মাজারের ভেতরে দেখা গেল বিভিন্ন স্থানে লোকজন জড়ো হয়ে গান শুনছে, শিল্পীদের ভক্তরা কেউ টাকা ছুঁড়ে দিচ্ছে। আবার কেউ টাকার মালা শিল্পীর গলায় পরিয়ে দিচ্ছে। আরও ভেতরে গিয়ে দেখা গেল, বটগাছের নিচে বসে আছে অদ্ভুত এক লোক, যার পরনে চটের তৈরি পোশাক, মাথায় ও দাড়িতে জট, গলায় বিভিন্ন রকমের ১৫ থেকে ২০টি মালা। হাত ও পায়ের আঙুলে বিভিন্ন রঙের ১০-১৫টি আংটি। পাশে বসে থাকা ভক্তরা তাকে বাবা বলে সম্বোধন করছে। দুই-একজন বাবার হাত-পা টিপে দিচ্ছে। অনেকে আবার বাবার হাতে টাকা, মোমবাতি, আগরবাতি, গোলাপপানি ও সিগারেট ধরিয়ে দিচ্ছে। তাদের মধ্য থেকে কামাল নামে একজন বলেন, মানুষ বাবাকে ভক্তি করে এগুলো দেয়।’
বামদিকে মাজারের প্রশাসনিক ভবনের পেছনে গিয়ে দেখা গেল- প্রতিটি দলে ৪-৫ জন জটলা পাকিয়ে বসে কেউ গাঁজা বানাচ্ছে, কেউ সিগারেট কিংবা কলকি দিয়ে খাচ্ছে আর সুরে-বেসুরে গান করছে। এরই মাঝে হঠাৎ হঠাৎ হোব বাবা-হোব বাবা বলে চিৎকার করছে। অথচ ১০-১৫ গজ দূরেই দাঁড়িয়ে আছে পুলিশ।
মাজারের পূর্ব-পশ্চিম-দক্ষিণ দিকে ছোট-বড় সব মিলিয়ে ৭০-৮০টি দোকান আছে, যেগুলো মাজার কর্তৃপক্ষ পরিচালনা করে। ছোট দোকানগুলোর মাসিক ভাড়া দোকান-প্রতি ৫-৭ হাজার টাকা এবং বড় দোকানগুলোর (যেগুলো কলার আড়ত নামে পরিচিত) মাসিক ভাড়া ২০-৩০ হাজার টাকা। তাছাড়া দোকান-প্রতি অগ্রিম ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া আছে। মাজারের পশ্চিম পাশে রাস্তার বিপরীতে বিশাল মাঠ, যা বালু দিয়ে ভরাট করা হয়েছে।
নাম গোপন রাখার শর্তে এক ব্যবসায়ী বলেন, খালি জায়গাগুলো কাঁচামালের আড়তের জন্য ভাড়া দেওয়া হচ্ছে। যার জন্য অগ্রিম নেওয়া হচ্ছে (জায়গার আকার অনুপাতে) ২ লাখ থেকে শুরু করে ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত।
মাজারের খাদেম আনোয়ারুল হকের কাছে মাজারের আয়-ব্যয় প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বলেন, মাজারের কমিটিতে আছেন স্থানীয় প্রভাবশালী নেতারা। তারাই এ বিষয় ভালো বলতে পারবেন।’
স্থানীয় সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা- মাজার এলাকা থেকে মদ, গাঁজা, ভণ্ডামি, কুসংস্কার, নারী ব্যবসা, অর্থ লুটপাট বন্ধ হোক। মাজারটি ধর্মীয় কাজে ব্যবহার করে ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা হোক।
উল্লেখ্য, ঢাকাবাসীর কাছে পরিচিত একটি নাম হযরত শাহ্‌ আলী (র.), যা আবার অনেকের কাছে খুব প্রিয় ও পবিত্র। নামটির প্রতি অনেকের ভালোলাগা-ভালোবাসা একটু বেশি। এ নামের ওপর ভিত্তি করে ঢাকায় তৈরি হয়েছে অনেক প্রতিষ্ঠান। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- শাহ্‌ আলী শপিং কমপ্লেক্স, শাহ্‌ আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজ মার্কেট, শাহ্‌ আলী সরকারি মার্কেট, হযরত শাহ্‌ আলী মহিলা কলেজ অ্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়, হযরত শাহ্‌ আলী হাইস্কুল, হযরত শাহ্‌ আলী কামিল মাদ্রাসা, শাহ্‌ আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শাহ্‌ আলী আবাসিক হোটেল, শাহ্‌ আলী থানা, শাহ আলী ফেরি, এমনকি শাহ্‌ আলী পরিবহনও রয়েছে। তবে সবচেয়ে পরিচিত শাহ্‌ আলী মাজার শরিফ। যেখানে শায়িত আছেন হযরত শাহ্‌ আলী বোগদাদী নামে এক বুজুর্গ ব্যক্তি।
ইতিহাসের পাতা থেকে জানা যায়, ১৪৮০ সালে দিল্লির সম্রাট মিরপুরের এ এলাকায় একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। ১৫৭৭ সালে বাগদাদ থেকে হিন্দুস্তানে আসেন শাহ্‌ আলী। সেখান থেকে ঢাকায়। এখানে এসে তিনি মসজিদটিকে ধ্বংসাবস্থায় দেখতে পান। তখন তিনি দরজা বন্ধ করে চিল্লায় বসেন। তার কাছে এই ৪০ দিন সবার যাতায়াত বন্ধ ছিল। এরপর তার নামে স্থানটির নামকরণ করা হয় শাহ্‌ আলী মাজার শরিফ। ১৯৬২ সালে ৪৫০ একর জমি মাজারের নামে ওয়াকফ্ করা হয়, যার প্রায় অর্ধেকই বর্তমানে স্থানীয় নেতাদের দখলে। ১৯০৭ সালে তৃতীয়বারের মতো পুনর্নির্মাণ করা হয় মাজারটি। এ মাজারটি ঘিরে পরবর্তীকালে গড়ে উঠেছে ছোট ছোট ৮-১০টি মাজার ও দরবার শরিফ।
Print Friendly, PDF & Email

Mdh Mahadi