Atheist in Bangladesh

মুসলমানদের ভেতরের কালো কালো অন্ধকার

এমডি মাহাদি হাসান: ১৯২২ সালে কোলকাতার রাস্তায় আনন্দ মিছিল বের করেছিল মুসলমানরা তুরস্কের কামাল পাশার বিজয় উপলক্ষ্যে! নজরুলের উচ্ছ্বাসিত হয়ে লেখা ‘কামাল তু নে কামাল কিয়া ভাই’ কবিতাটি গাইতে গাইতে তারা রাজপথ দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল। অবিভক্ত ভারতবর্ষের মুসলমানরা তখন দুইভাগে বিভক্ত।
গোঁড়া ধার্মীক মুসলমানরা ওসমানিয়া খিলাফতের শেষ সুলতান সুলতান ওয়াহিদুদ্দিন পক্ষে। কিন্তু নজরুলের মত প্রগতিশীল, আধুনিকরা আতার্তুক কামাল পাশার পক্ষে। ভারতবর্ষের মানুষ যেখানে নিজেরাই পরাধীন সেখানে তুরষ্কের খেলাফত নিয়ে তারা শোকে মুর্হমান! আবার আরেক দল কামাল পাশার ক্ষমতায় আরোহনে রাস্তায় ধেই ধেই করে নাচতে শুরু করে। আশ্চর্য হতে হয় ওসমানিয়া খিলফাতের সুলতান ওয়াহিদুদ্দিনকে ভারতের মুসলমানরা নিজেদের খলিফাই জ্ঞান করত!
কবি কাজি নজরুল ইসলাম যখন আমাদের প্রগতিশীলতার একটা ‘ব্র্যান্ডএম্বাসেডর’ হতে পারেন, একইভাবে তিনি যখন ইসলামপন্থি রক্ষণশীলদের হাতে ব্যবহৃত হন তখন যে সত্যটি আমাদের সামনে আসে- মডারেট পন্থা অবলম্বণ করে কোন ধর্মীয় সম্প্রদায়কে যুপোযুগি করে তোলার কৌশল ভবিষ্যতে রক্ষণশীলদের হাতে সেটাই অস্ত্র হয়ে দেখা দেয়। আমাদের সকলের একটা ধারনা বদ্ধমূল হয়ে দাঁড়িয়েছে মুসলিমদেরকে তাদের ধর্মের সোজাসুজি সমালোচনা করে কিছুতে মন পাওয়া যাবে না।
তাদেরকে ইসলামের পক্ষে দুটো প্রশংসা করে তারপর আধুনিকায়নের কথা বলতে হবে। রোকেয়ার বোরখা প্রশংসা সেই কৌশলই মনে হয়। কিন্তু উনার নারী শিক্ষার যে সংগ্রাম সফল হয়ে মুসলিম নারী আজ অন্তঃপুর থেকে বাইরে আসতে পেরেছে, সেই সুফল ভোগ করে একজন নারী ডাক্তার কিংবা ব্যাংকার যখন হিজাব পরে নারীদের অগ্রযাত্রার বর্তমান সময়কে অস্বীকার করতে চায়, বেগম রোকেয়ার লেখাকে কোট করে বিভ্রান্ত করতে চায় তখন খুব করে মডারেট পন্থাকে ভবিষ্যতের জন্য আত্মঘাতিই মনে হয়।
কাজি নজরুল ইসলামের ‘কোরবানী’ নামের একটি কবিতা আছে। জানা যায় তৎকালে একজন লেখক কুরবাণীকে একটি বর্বর ও নৃশংস প্রথা বলে কাগজে প্রবন্ধ লিখেন। লেখক কোন অমুসলিম নন, তার নাম তরীকুল ইসলাম। নজরুল তরিকুল ইসলামের প্রবন্ধের ক্ষুব্ধ ও তীব্র প্রতিবাদ করে কুরবাণী নিয়ে কবিতায় লেখেন, ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’, শক্তির উদ্‌বোধন।/দুর্বল! ভীরু! চুপ রহো, ওহো খাম্‌খা ক্ষুব্ধ মন!/ধ্বনি ওঠে রণি দূর বাণীর,–/আজিকার এ খুন কোর্‌বানির!/দুম্বা-শির রুম্ বাসীর/শহীদের শির-সেরা আজি। –রহমান কি রুদ্র নন?/বাস্‍! চুপ খামোশ রোদন! (অগ্নিবীণা গ্রন্থ খেকে)…
তরিকুল ইসলাম তার প্রবন্ধে কি লিখেছিলেন সেটা জানতে পারি সলিমুল্লাহ খানের বরাতে আবদুল কাদিরের লেখায় জানা যায়- ‘আজ এই আনন্দ উৎসবে আনন্দের চেয়ে বিষাদের ভাগই মনের উপর চাপ দিচ্ছে বেশী করে। যেদিকে তাকাচ্ছি, সেই দিকে কেবল নিষ্ঠুরতার অভিনয়। অতীত এবং বর্তমানের ইতিহাস চোখের সামনে অগণিত জীবনের রক্তে ভিজে লাল হয়ে দেখা দিচ্ছে। এই লাল রঙ আকাশে-বাতাসে চারিদিকে ছড়িয়ে রয়েছে–যেন সমস্ত প্রকৃতি তার রক্তনেত্রের ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে পৃথিবী বিভীষিকা করে তুলেছে। প্রাণ একেবারে হাঁপিয়ে উঠছে…’।
মধ্যযুগীয় খিলাফত থেকে মুক্ত হয়ে আধুনিক কামাল পাশায় তুরষ্ক যখন সমৃদ্ধ হয় তখন সেটা নজরুলদের কাছে উল্লাসের হলেও তরিকুলের রচনা কেন ক্ষুব্ধ করে? সম্ভবত এটা সেই চিরন্তন রোগ- ইসলামের বিরুদ্ধে ডাইরেক্ট কিছু বলে মুসলমানদের নাকি সংস্কার সম্ভব না। তা কিভাবে সম্ভব?
নজরুলের কুরবানী কবিতার রচনার ইতিহাস তুলে ধরে আজকে যখন তাকে নিয়ে ঢাকার ‘মুসলিম জাতীয়তাবাদী কবি-সাহিত্যি-বুদ্ধিজীবীরা’ নজরুলকে তাদের পক্ষে প্রচার চালায় তখন বুঝতে পারি, নজরুলের কৌশল, রোকেয়ার কৌশলকেই আজ মধ্যযুগে ফিরতে উম্মুখ একটা সম্প্রদায়ের শিক্ষিত জনগোষ্ঠি তাদের কাজে লাগাচ্ছে। এটাকে বুমেরাং বলা ছাড়া আর কি বলা যাবে।
‘ইসলাম শান্তির ধর্ম’ এটা বলে আর যাই হোক ইসলাম থেকে সন্ত্রাস দূর করা যাবে না! এই সোজা কথাটা যদি এখন আমরা সোজা করে না বলি তো ভবিষ্যতে আমাদের ঘুরিয়ে-পেচিয়ে বলা কথার ভিন্ন অর্থ ও ভিন্ন প্রচারে কাজে লাগাবে।
Print Friendly, PDF & Email

Mdh Mahadi