Atheist in Bangladesh

দুনিয়া কাঁপানো কোভিড-১৯ প্যানডেমিক!

করোনাভাইরাস মহামারি নিয়ে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাব, সেটা আমরা বোধহয় শিখতে পারি এলিজাবেথ কুবলা-রসের(ট) (Elisabeth Kübler-Ross) কাছ থেকে, ‘অন ডেথ অ্যান্ড ডায়িং’ বইতে বাঁচার আশা নেই এমন অসুখের কথা জানার পর আমাদের প্রতিক্রিয়া কেমন হয়, সেটা নিয়ে তিনি বিখ্যাত পাঁচ পর্যায়ের রূপরেখা পেশ করেন: প্রত্যাখ্যান (সত্য স্বীকারে নির্জলা অস্বীকার: ‘এটা কোনোভাবেই হতে পারে না, আমার সঙ্গে তো নয়ই।’); ক্রুদ্ধভাব (যখন আর সত্যকে না স্বীকার করে উপায় নেই তখন রাগে ফেটে পড়া: ‘কীভাবে এমনটা হলো আমার সঙ্গে?’); দর-কষাকষি (আশা করতে থাকা যে কোনোভাবে এই সত্য স্থগিত বা মিথ্যা হয়ে যাবে: ‘আমার বাচ্চাদের সাবালক হওয়া পর্যন্ত বাঁচতে দাও।’); বিষাদ (কাজকাম থেকে মনোযোগ উঠিয়ে নেওয়া: ‘মারাই তো যাচ্ছি, এত কিছু ভাবার দরকার আছে কি?’); বরণ (‘আমি লড়াই করে পারব না, বরং এর জন্য প্রস্তুত হই।’)। পরে কুবলা-রস এই পর্যায়গুলোকে প্রয়োগ করেন যেকোনো ভয়াবহ ব্যক্তিগত লোকসানের ক্ষেত্রে (চাকরিচ্যুতি, প্রিয়জনের মৃত্যু, মাদকাসক্তি), এবং তিনি আরও বলেন, পর্যায়গুলো যে উল্লিখিত ক্রমানুসারেই আসবে, তা নয়, আবার সব ভুক্তভোগী যে পাঁচটি পর্যায়ের ভেতর দিয়েই যাবেন, তা-ও নয়।

যখনই কোনো সমাজ ভীতিকর ছন্দপতনের মুখোমুখি হয়, তখন যেকোনো বোধশক্তিসম্পন্ন লোকই ওই পাঁচ পর্যায়কে উপলব্ধি করতে পারে। প্রথমে ধরুন, পরিবেশ বিপর্যয়ের হুমকির বিষয়টি: শুরুর দিকে আমরা এটিকে অস্বীকার করেছি (এগুলো বিশুদ্ধ প্রলাপ, যা ঘটছে সেটি আবহাওয়ার নানা স্তরের স্বাভাবিক হেলদোল); এরপর লোকজন ক্রুদ্ধ হলেন (বড় বড় করপোরেটগুলোতে যাঁরা আছেন—আমাদের পরিবেশ দূষণ করে, সরকারে যাঁরা আছেন—বিপদকে তাঁরা পাত্তা দেন না।); আর এরপরই শুরু হয় দর-কষাকষি (আমরা যদি আমাদের বর্জ্যকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য করে তুলি, কখনো সেটা আমরাই কিনতে পারব; ওতে [জলবায়ু পরিবর্তনে] কিছু ভালো দিকও রয়েছে: গ্রিনল্যান্ডে আমরা সবজি ফলাতে পারব, জাহাজে করে চীন থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দ্রুত মালামাল বহন করা যাবে নতুন উত্তরাঞ্চলীয় পথটি দিয়ে, সাইবেরিয়াতে নতুন নতুন উর্বর ভূমি ব্যবহারযোগ্য হয়ে উঠছে, যেহেতু ভূগর্ভস্থ চিরহিমায়িত অঞ্চলের বরফ গলে যাচ্ছে… ), বিষাদ (অনেক দেরি হয়ে গেছে, আমরা হেরে গেলাম…); এবং, সর্বশেষ, বরণ—আমরা ভয়ানক হুমকির মুখোমুখি, আর তাই আমাদের গোটা জীবনাচরণ পাল্টে ফেলতে হবে!

এটি একইভাবে সত্যি আমাদের জীবনের ক্ষেত্রেও, ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠা ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণের হুমকি: প্রথমে, আমরা বিষয়টিকে অত পাত্তা দিতে চাইনি (এটি অতিরঞ্জন, বামপন্থী মানসিক বৈকল্য, কোনো মাধ্যমই আমাদের প্রাত্যহিক কাজকর্মকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না); তারপর আমরা ক্ষোভে ফেটে পড়লাম (বড় বড় কোম্পানি ও রাষ্ট্রের গোপন সংস্থার ওপর, যারা আমাদেরকে আমাদের নিজেদের চেয়েও ভালোভাবে জানে এবং সেই জ্ঞান তারা ব্যবহার করে আমাদের নিয়ন্ত্রণ ও নিপুণ কায়দায় পরিচালনা করতে); পরবর্তী পর্যায় দর-কষাকষি (সন্ত্রাসীদের খোঁজার অধিকার কর্তৃপক্ষের আছে, কিন্তু গোপনীয়তায় লঙ্ঘন করার অধিকার তাদের নেই…); এরপর আসে বিষাদ (অনেক দেরি হয়ে গেছে, আমাদের গোপনীয়তা বলে আর কিছু নেই, ব্যক্তিগত স্বাধীনতার কাল শেষ); আর পরিশেষে, বরণ (ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ আমাদের স্বাধীনতার জন্য হুমকি, আমাদের উচিত এর প্রতিটি মাত্রা সম্পর্কে ব্যাখ্যা করে জনগণকে সচেতন করা এবং এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নিজেদের যুক্ত করা)।

মধ্যযুগে প্লেগের চিহ্ন দেখলে সংক্রমিত শহরের লোকজন একই রকম করে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করত: প্রথমে অস্বীকার, এরপর পাপপূর্ণ জীবনের প্রতি রাগ, কারণ, ওই পাপের কারণেই এমন শাস্তি, অথবা নিষ্ঠুর ঈশ্বরের প্রতি ক্ষোভ, যিনি এই মড়ক দিয়েছেন, তারপর দর-কষাকষির পালা (মড়ক অত খারাপ নয়, যারা অসুস্থ, তাদের এড়িয়ে চললেই হলো…), পরবর্তী পর্যায় বিষাদ (আমাদের জীবন শেষ…), এরপর, মজার বিষয় হলো, বেলেল্লাপনা (জীবন তো শেষই, চলো এর মধ্যেই যতটুকু সম্ভব প্রচুর পান ও সংগমের মজা বের করে নিতে হবে), এবং পরিসমাপ্তিতে বরণ (এই তো আমরা, চলো যতটুকু পারা যায়, স্বাভাবিক জীবনাচরণ করি…)।

২০১৯ সালের শেষ দিক থেকে, করোনাভাইরাস মহামারি আকারে ছড়ানো শুরু হওয়ার পর, আমরাও কি একই রকম আচরণ করছি না? প্রথম প্রথম লোকজন অস্বীকার করেছে (সে রকম বড় কিছু হচ্ছে না, কয়েকজন দায়িত্বজ্ঞানহীন ব্যক্তি শুধু শুধু ভীতি ছড়াচ্ছে); এরপর রাগ (মোটামুটি বর্ণবাদী বা রাষ্ট্রবিরোধী কাঠামোর ভেতর: চীনারাই দায়ী, আমাদের রাষ্ট্র করিৎকর্মা নয়…); এরপর দেখি দর-কষাকষি (ঠিক আছে, কয়েকজন আক্রান্ত হয়েছে, কিন্তু এটা সার্সের (SARS) মতো ভয়ানক নয়, আমরা ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনতে পারব…); এই পর্যায়ও যখন অকেজো হলো, তখন বিষাদ ভর করল (আর নিজেদের ভুলিয়ে রাখার দরকার নেই, আমরা সবাই শেষ)…কিন্তু শেষ পর্যায়ের বরণ দেখতে কেমন লাগবে? অদ্ভুত একটা ব্যাপার হলো, এই মহামারির একটি বৈশিষ্ট্য মিলে যায় সাম্প্রতিক সময়ে ফ্রান্স অথবা হংকংয়ের মতো জায়গায় ঘটে যাওয়া সামাজিক আন্দোলনের সাথে। আন্দোলনগুলো জাগরণ তুলে হারিয়ে যায়নি, লাগাতার চলেছে, এবং আমাদের জীবনে স্থায়ী ভয় ও ভঙ্গুরভাবের সঞ্চার করেছে।

আমাদের মেনে নেওয়ার পাশাপাশি নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে হবে জীবনের অন্য এক স্তরের সঙ্গেও, যেখানে অপরিপক্ক ভাইরাসগুলো, জ্যান্ত-মরা, বোকার মতো ফিরে ফিরে আসে, সব সময়ই মজুদ থাকে, আর আমাদের সঙ্গে লেগে থাকে গাঢ় ছায়ার মতো, হুমকি হয়ে দাঁড়ায় আমাদের টিকে থাকায়, এবং কিছু বুঝে ওঠার আগেই তা ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি আরও সাধারণ স্তরে ভাইরাসজনিত মহামারি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জীবনের চরম আকস্মিকতা ও অর্থহীনতা: আমরা, মানবজাতি, যত মহৎ আধ্যাত্মিক প্রাসাদই বানাই না কেন, ভাইরাস বা গ্রহাণুর মতো বেকুব প্রাকৃতিক আকস্মিক ঘটনা সবকিছুর ইতি টেনে দিতে পারে…বলার অপেক্ষা রাখে না, পরিবেশের সঙ্গে প্রাণীকুলের সম্পর্ক থেকে যা শিখেছি, আমরা, মানবজাতি, নিজের অজান্তেই নিজেদের শেষ পরিণতি ডেকে আনতে পারি।

Print Friendly, PDF & Email

কমল চন্দ্র দাশ