Atheist in Bangladesh

মানুষের মর্যাদা ও ধর্ম

লিখেছেনঃ হোসাইন মোহাম্মদ পারভেজ

যে কোন সময়ে আপনি মারা যেতে পারেন। স্বাভাবিক মৃত্যুর কথা বলছি না। প্রাত্যহিক যেসব দুর্ঘটনায় মানুষ মারা যায় সেসবের কথাও বলছি না। মানুষের মর্যাদা বিচ্যুত হয়ে কারো না কারো পরিকল্পিত খুন বা গণহত্যার শিকার হয়ে মারা যাওয়ার কথা বলছি। চাপাতির কোপে অথবা বোমা হামলায় মরার কথা বলছি। এভাবে মরার জন্যে আপনাকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশে সংখ্যালঘু নাস্তিক হওয়া লাগবে না, হিন্দুর দেশে গরু খাওয়া মুসলমান অথবা বৌদ্ধের দেশে রোহিঙ্গা হওয়া লাগবে না। আপনি সংখ্যাগুরু মুসলমানের দেশে মুসলমান হয়েও মরতে পারেন। মিশরের মতো মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়ে শ তিনেক নিহত মানুষের মতো ক্যাজুয়ালিটির সংখ্যার অংশ হয়ে যেতে পারেন। ইয়েমেনের মতো নিজের প্রিয়জনের জানাজার নামাজ পড়তে গিয়ে বিমান হামলায় পরিবারসহ বিনাশ হয়ে যেতে পারেন। আপনার সংখ্যাগুরুত্বের গর্ব কোন কাজে আসবে না। কারন একবিংশ শতকের এই দুনিয়ায় প্রতিনিয়ত কেউ না কেউ আপনাকে, আপনার মতো আরো বহু মানুষকে গরু, ছাগলতো বটেই এমনকি পোকা মাকড়ের মতো নির্দয়ভাবে অথবা সাঁপের মতো ঘৃণা সহকারে হত্যাযোগ্য জীবের অন্তর্ভুক্ত করার এই জ্ঞান উৎপাদন করে যাচ্ছে। কখন আপনি তাদের উৎপাদিত জ্ঞানে হত্যাযোগ্য জীবের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবেন, কখন আপনার নাম হিসাবের খাতায় উঠে যাবে আপনি বুঝতেও পারবেন না।

তবে কিভাবে মানুষ হত্যাযোগ্য জীব হয়ে যায় তা উদাহরণ দিয়ে আলাপ করা যেতে পারে। যেমন ধরেন যে সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি কিছুদিন আগে ইহুদীদের হত্যা করা হারাম বলে ফতোয়া দিয়েছেন কিংবা মোহাম্মদ নামের এক ব্যাক্তি যেভাবে কোরান নামের একটা ভুয়া গ্রন্থ বানিয়ে হত্যার কথা বলে। আপনি হয়তো ভাববেন হত্যা করা হারামের ফতোয়া কিভাবে উদাহরণ হতে পারে? প্রথমত, ইহুদিরা কি তবে এই ফতোয়া দেয়ার আগে হত্যাযোগ্য ছিল? তা ছিল বটে অনেকের কাছে। ইহুদিতো বটেই, খ্রিস্টানদের হত্যা করার ফতোয়াও তো অনেকে দিয়েছেন। অর্থাৎ আমি মানুষকে হত্যাযোগ্য ও হত্যাযোগ্য নয় হিসাবে বিভাগ তৈরি করার যে জ্ঞান, বিভাজনের সেই জ্ঞানের ডিসকার্সিভ উৎপাদনের কথা বলছি। নানাজনের ফতোয়া, বক্তৃতা অথবা লেখালেখির মধ্য দিয়ে এই ধরণের বিভাগ তৈরি করা হয়। গ্র্যান্ড মুফতির যে ফতোয়ার কথা বলছি সেই একি ফতোয়াতে তিনি হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসাবে ঘোষনা করেছেন। সন্ত্রাসী হলো বর্তমান সময়ে প্রচলিত অন্যতম একটি ট্যাগ যা আপনার গায়ে লাগিয়ে দিলে আপনি আইনের বাইরে থাকা হত্যাযোগ্য জীবে পরিণত হয়ে যাবেন। অথচ হামাস একটি রাজনৈতিক সংগঠন, তাদের সাথে ইসরায়েলের লড়াইটা বিভিন্ন সময়ে সামরিক (একপাক্ষিক সন্ত্রাসী হামলা নয়) হলেও মূলত রাজনৈতিক। এই গ্র্যান্ড মুফতিই কা’বায় দুর্ঘটনায় বহু মুসলিমের (যাদের একটা বড় অংশই ছিল ইরানের নাগরিক) মৃত্যুর পর ইরানের সমালোচনার জবাবে ইরানিদেরকে অমুসলিম বলে ঘোষনা দিয়েছিলেন। যেন বা অমুসলিমদের মৃত্যুতে কিছু যায় আসে না।

তবে গ্র্যান্ড মুফতির উদাহরণ একটি উদাহরণ মাত্র। দিনশেষে তিনি সৌদি রাজবংশের একজন কর্মচারির মতো, তিনি সৌদি রাজবংশ ও আমেরিকার স্বার্থে কে হত্যাযোগ্য ও কে হত্যাযোগ্য নয় তা নির্ধারণ করে দিতে চাচ্ছন। কিন্তু একজন মানুষের পক্ষে হত্যাযোগ্য জীবের বিভাগ তৈরি করা সম্ভব না। এইধরণের বিভাগের ডিসকার্সিভ উৎপাদনে ভূমিকা রাখে আল-কায়েদা, আইসিসের মতো বিভিন্ন সংগঠনের ফতোয়াবাজ থেকে শুরু করে ওয়াজ মাহফিলে টাকার বিনিময়ে ওয়াজ করতে আসা মোল্লা মাওলানা, এমনকি ইন্টারনেট ইসলামিস্ট সেলিব্রিটি ফারাবি শফিউর রহমানরা, সবাই মিলেমিশে। বাংলাদেশে যেমন সমাজের বড় একটি অংশ ম্যাস মিডিয়া, বক্তৃতা, ওয়াজ, লেখালেখি ইত্যাদির মাধ্যমে নাস্তিকদেরকে হত্যাযোগ্য জীবে পরিণত করেছে। আপনি, আপনারা প্রতিনিয়ত কিছু না কিছু বলে বা লিখে, অথবা শ্রেফ চুপ করে থেকে হত্যাযোগ্য জীবের ক্যাটাগোরি উৎপাদনে অংশগ্রহণ করে যাচ্ছেন। কিন্তু তাতে আপনি বেঁচে যাবেন না। ইদ্গাহে নামাজ পড়তে গিয়ে অথবা রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়ে নিজেকেই আবিস্কার করতে পারেন হত্যাযোগ্য জীবের ক্যাটাগোরিতে।

হত্যাযোগ্য জীবের ডিসকার্সিভ উৎপাদনের এই সামাজিক ভূমিকাটা বিশেষভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। আগের কালে বিষয়টা ভিন্ন ছিল। একমাত্র খলিফা, রাজা, সম্রাট অর্থাৎ সার্বভৌম শাসকদেরই শুধু ক্ষমতা ছিল কে হত্যাযোগ্য আর কে হত্যাযোগ্য নয় তা নির্ধারণ করার। আধুনিক যুগে এটা হয়ে গেছে সামাজিক ব্যাপার, গণতান্ত্রিক সমাজের পপুলিস্ট রাজনীতির অংশ। সবাই এখন সার্বভৌম। আগের কালের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলার না ছিল ম্যাস মিডিয়া, না ছিল তখন মসজিদে মাইক, না ছিল ইন্টারনেট অথবা ফেসবুক। ফলে এখন হত্যাযোগ্য জীবের ক্যাটাগোরি যতো সহজে ও দক্ষতার সাথে উৎপাদন করা সম্ভব আধুনিক যুগের পূর্বে তা সম্ভব ছিল না। আধুনিক পপুলিস্ট রাজনীতির বুলি এবং আধুনিক রাষ্ট্রের দক্ষতা ব্যবহার করেই নাজি জার্মানিতে মানুষকে বহু ভাগে ভাগ করা হয়েছিল, কিছু মানুষকে ডিসকার্সিভভাবে হত্যাযোগ্য জীবে পরিণত করা হয়েছিল। এদেরই জায়গা হয়েছিল কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের গ্যাসের চুলায়। সেই কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প এখন আরাকানে হাজির, সেই গ্যাসের চুলার আগুনে পুড়ে যায় মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বাড়ি, বাংলাদেশের হিন্দু অথবা পাহাড়ের আদিবাসীর। মার্ক্সিয় ভাষায় যারে আইডিওলজি বলে সেই আইডিওলজি এখন আর শুধু আইডিন্টিটির উৎপাদনই করে না, বরং আইডিন্টিটিকে ভিত্তি দেয়াই তার প্রধান কাজ। এবং অন্যদের মানুষ অথবা মুসলমান অথবা বাংলাদেশী আইডিন্টিটি খারিজ করার। কুফরের ধারণা ইসলামি আইডিওলজির জন্যে জরুরি হলেও কাউকে কাফির বলাটা আগেরকালে খুব প্রচলিত ছিল না। আর এখন অপরকে কাফির বলার মাধ্যমে মানুষ মুসলমান হয়ে উঠছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে ইউরোপের মানুষ মানুষকে বিভাগ নির্ভর আধুনিক জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত করার বিপদ বুঝতে পেরেছিল। ফলে যুদ্ধ শেষ হতে না হতেই ঘোষনা দেয়া হলো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের। দেখা গেলো যে আধুনিকতার বিপদ মোকাবেলার উপায় আধুনিকতার মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে না। ধার করতে হলো ইহুদি-খ্রিস্টান-ইসলামি ট্র্যাডিশনের মানবিক মর্যাদার ধারণা। যে মানবিক মর্যাদার ধারণা আদম-ইসা-মুহাম্মদের সাথে, আদমের সন্তানদের সাথে আল্লাহর বিশেষ সম্পর্ক, আশরাফুল মাখলুকাতের বাকি সব জীবের চাইতে শ্রেষ্ঠত্ব, আদমকে এমনকি ফেরেশতাদের সিজদা করার বর্ণনার মাধ্যমে তৈরি হয়েছিল। এক আল্লাহর সাথে মানুষের সম্পর্ক নির্মানের মধ্য দিয়েইতো এককালে ব্যক্তি মানুষের উৎপাদন ঘটেছিল।

ব্যক্তিগতভাবে জীবের সাথে তুলনা করে মানুষের আলাদা মর্যাদা প্রতিষ্ঠার এই ধারণাও আমার কাছে বিপদজনক মনে হয়, এবং আধুনিকতার অনেক সমস্যার গোড়ায় ইহুদি-খ্রিস্টান-ইসলামের ধর্মতাত্ত্বিক প্রভাবকেও বিশেষভাবে চিহ্নিত করার দরকার আছে। কিন্তু মানুষকে জ্ঞানের বিষয়ে পরিণত করে বিভাজন করার, হত্যাযোগ্য ও হত্যাযোগ্য নয় এমন বিভাগের অন্তর্ভুক্ত করার বিপদ আমরা কবে বুঝতে পারবো? ইউরোপের মানুষের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে। আমাদের কোন অভিজ্ঞতা লাগবে? দেখে কি শেখা যায় না? ঠেকেই শিখতে হবে?

Atheist in Bangladesh