খুনীদের মনের গহীনে কয়েকটি ঘুনপোকা

0

লিখেছেন, সিনথিয়া আরেফিন

ব্লগার থাবা বাবার (রাজীব) হত্যাকান্ড নিয়ে একটি রিপোর্ট পড়লাম। এই রিপোর্টের কিছু অংশ এখানে তুলে দিচ্ছিঃ

বসার ঘরে এলেন রাজীবের মা মাহবুবা রাব্বী। এর মধ্যে তিনি জেনে গেছেন, আমি সাংবাদিক। জানতে এসেছি রাজীবকেতিনি বাকশূন্য, হতবিহ্বল। কি বলবেন খুঁজে পাচ্ছেন না যেন। খুব ধীরে আস্তে আস্তে বলছেন, আমার ছেলেটা যদি বখাটে হতো, দুষ্টু হতো তাও মানতে পারতাম। আহারে, আমার কলিজার টুকরা। আমার জানের বদলে যদি আমার তনয় ফিরে আসতো। আমার শেষ বয়সের সম্বল, কাকে নিয়ে আমি বাঁচবো। আর পারলেন না, কেঁদে ওঠেন।

রাজীবকে নিয়ে মায়ের অনেক কথা, কোনটা বলবেন কোনটা বলবেন না, ও মোটা হয়ে যাচ্ছিল বলে মাঝে মাঝে খেতে চাইতো না, সোমবার পরীক্ষা দিতে যাবে জন্য তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে গেল, বল্লো এসে খাবোনিআহারে, আমার বাবুটা.. বলেই আবারো কেঁদে ওঠেন।ও কি ওইদিন আর কিছু খেয়েছিল।

শিল্পকলায় আমার বাবুর রিহার্সেল ছিল। সময় মতো যায় না দেখে লিয়াকত আলী লাকীর বোন বার বার রাজীবকে ফোন করছিলেন, ফোনে না পেয়ে উনি চিন্তিত হয়ে পড়েন। কারণ রাজীব কখনোই এসব ব্যাপারে অবহেলা করতো না। এদিকে এসএ টিভিতে ও পাপেট শো করতো, ওরাই বলেছিল, কলাবাগানে একটা মারামারি হয়েছে টিভিতে দেখাচ্ছে। তন্দ্রাকে এসব বলে ফোন করে বল্লো একটু খোঁজ নাও। আমি বলি, আমার ছেলে আর মারামারি। কিন্তু সব মিথ্যা ওর মৃত্যুটাই সত্যি।

 

আমি বিশ্বাস করিনি। আমার মেয়ে আমাকে কলাবাগানে নিতে চায় না। আমি জোর করে যাই। গিয়ে দেখি কত রক্ত। তার মধ্যে আমার রাজীব, আমার সোনামনি উপড় হয়ে আছে। অন্য কেউ বুঝতে পারেনি। আমি দেখেই বুঝে গেছি। ও মা, এ দৃশ্য দেখার আগে আমি কেন মরে গেলাম না। আমি এখনও কি করে বেঁচে আছি। আমি তো একরাতও ওকে ছাড়া থাকতে পারি না। ও বিদেশ গেছে আমার ভালো লাগে না। আমার বাবু কবে আসবে এই ভাবনায় থাকতাম।

তন্দ্রা বলেন, ও এমন একটা ছেলে কোনোদিন জেদ করেনি, কিছু চায়নি। কাউকে বকা তো দুরে ও কাউকে বিরক্ত করেনি। কি অপরাধ ছিল আমার ভাইয়ের। অপরাধ যদি থাকে তার বিচার রাষ্ট্র করবে, আল্লাহ করবে। মেরে ফেলার রাইট কে দিয়েছে ওদের।

রাজীবের খুনসুঁটির কথা জানতে চাইলে মা বোন এক সঙ্গে বলেন, ও এমন ছেলে রাগ জেদ এসব ছিলো না। ওঁর ছবি দেখতে চাইলে মেয়ে তন্দ্রাকে থামিয়ে দিয়ে রাজীবের মা বের হয়ে গেলেন। হাতে করে বেশ কিছু ছবি নিয়ে ঢুকলেন। ছবি দেখিয়ে শান্তি পাচ্ছিলেন না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গের ছবিটা কোথায়, রাজীবের ওই ছবিটা কোথায় এভাবে বলেই যাচ্ছিলেন।এখন এগুলো তার বড় সম্পদ। ছবি দেখতে মামারাও যোগ দিলেন। আবারও ভারি হয়ে গেল ঘরের বাতাস তাদের দীর্ঘশ্বাস আর কান্নায়।

রাজীবের ঘরটা দেখার ইচ্ছা বলতেই তন্দ্রা বলেন, ২৬ তারিখ রাতেই ডিবি এসে ওর বই খাতা থেকে শুরু করে সব কিছু নিয়ে গেছে। এখন ঘর ভর্তি শুধু মানুষ আত্মীয় স্বজন।

রাজীবের বাবা বাসায় ছিলেন, কিন্তু তিনি নির্বাক। কারো সঙ্গেই কথা বলছেন না। তিনি ছেলের মৃত্যুর খবর পেয়ে অবিশ্বাস নিয়ে ছুটে এসেছিলেন হাতিয়া থেকে। এসে দেখেন, সত্যি তার প্রাণ প্রিয় একমাত্র ছেলে আর নেই। সেই থেকে তিনি একেবারে চুপ হয়ে আছেন।

বহুদিন…বহুদিন পর এমন একটা লেখা পড়ে বড় বিষাদে আক্রান্ত হয়েছি। পুরো লেখাটা পড়লে কেমন যেন একটা শূন্যতা তৈরী হয়। রাজীবের মায়ের একটা ছবি ছেপেছে সেখানে। তনয় ভাই দেখতে পুরো তাঁর মা’র মত হয়েছেন। লেখাটা পড়ে যতসব অদ্ভুত প্রশ্ন, অদ্ভুত চিন্তা মাথায় এলো।

আচ্ছা খুনীরা কি খুন করে ঘরে ফিরে তাদের মা’কে বলে, মা ভাত দাও? কিংবা তাদেরও কি অমন বোন রয়েছে, তনয় ভাই এর মত? ওরাও কি এই জীবনে কখনো কেঁদেছে কোনো ভীষন দুঃখে? কেমন লাগে খুন করবার ঠিক কয়েক সেকেন্ড আগে কিংবা কয়েক সেকেন্ড পরে? তখন কি ওদের প্রচন্ড উত্তেজনা হয়? খুব পানি খেতে ইচ্ছে করে? একটা জীবন্ত মানুষকে চাপাতি দিয়ে হত্যা করবার পর ওদের দেখতে ঠিক কেমন দেখায়? ওদের বাসায় কি আয়না আছে? খুন করবার পর ওরা কি গোসল করে? আমার ধারনা করে। গোসল করে কি আয়নার সামনে গিয়ে চুল আঁচড়ায়? তেল দিয়ে খানিকটা সিঁথি…এমন।

ওরা কি খুনের দিন নামাজ পড়ে শুকরিয়া আদায় করে? দুহাত তুলে মোনাজাত করে বলে, “হে আল্লাহ, তোমার জন্য দুটো মানুষকে আজ সাড়ে পাঁচ ইঞ্চি কোপ দিয়ে এলাম, এই রক্ত তুমি গ্রহন কর”। আচ্ছা আল্লাহ কি এইসব শুনে অত্যন্ত ব্যাথিত হন নাকি আনন্দিত হন? তাঁরই রুহ ফুঁকে দেয়া একজন মানুষকে চাপাতি দিয়ে খুন করে আবার তাঁরই তৈরী একজন মানুষ সেটির জন্য আনন্দ প্রকাশ করে। পুরো ব্যাপারটাতে আল্লাহর কেমন লাগে? সূরা ওয়াকিয়াতে বলা রয়েছে মৃত ব্যাক্তির সবচাইতে নিকটে তিনি থাকেন। তিনি কি তনয় ও জুলহাজ ভাইয়ের পাশে ছিলেন? থাকার কথা। সূরা ওয়াকিয়ার ৮৫ নং আয়াতে তো তেমনই বলা রয়েছে।

খুনীদের কি প্রেমিকা আছে? নাকি নেই। খুব সম্ভবত নেই। খুনীরা মৃত্যুর পর পরজীবনে প্রত্যাশিত নারীদের জন্য খুব সম্ভবত অপেক্ষা করে। আচ্ছা এই খুনীদের মধ্যে কি কেউ বিবাহিত? কিংবা ঘরে সন্তান রয়েছে, স্ত্রী রয়েছে এমন?

সেক্ষেত্রে তারা কি করে? একটা মানুষকে ক্ষত বিক্ষত করে খুন করে কি ঘরে ফিরে তার বাচ্চাটাকে কোলে নেয়? কিংবা গভীর রাতে বাচ্চাটা ঘুম থেকে উঠে গেলে তাকে নিয়ে বারান্দায় হাঁটে। খুনীরা কি নাটক দেখে কিংবা সিনেমা? এই যে বসন্ত আসে, বসন্ত যায়, এই যে আমাদের সড়কে, এভিনিউতে এতসব মানুষ, আনন্দ, জীবন, যাপন, এসব কি খুনীদের ছোঁয়? ওরা কি কখনো খুন করে একটা ফুলের দোকানের পাশ দিয়ে রুদ্ধশ্বাসে পালিয়েছে? তখন কি তারা ফিরে দেখেছে যে একটা গোলাপ কেমন সুন্দর হতে পারে? খুব সম্ভবত দেখেনি। পালাবার সময় এত কিছু দেখলে চলে না।

রাজীবের খুনীদের আজ ইউটিউবের কয়েকটা ভিডিওতে অনেক্ষন ধরে সামনে আর পেছনে বার বার করে নিয়ে দেখলাম। এদের মধ্যে কয়েকজন তো দেখতে অপরূপ সুন্দর। কি টানা টানা মায়াময় মুখ। এত সুন্দর দেখতে কয়েকজন যুবক, এরা খুন করবার জন্য প্রতিদিন শাহবাগে গ্যাছে…রাজীবের পেছনে পেছনে ঘুরেছে…চাপাতি কিনেছে। আচ্ছা, এরা চাপাতি কিনবার সময় দোকানদারকে কি বলেছে? “ভাই একটা চাপাতি দেন…খুন করব”। খুব সম্ভবত এগুলো কিছু বলেনি। তারা হয়ত বলেছে, গরু কাটবে কিংবা ছাগল।

আমার আজ এইসব সব অদ্ভুত প্রশ্ন মাথায় ঘুরছে ওই লেখাটা পড়ার পর। কয়েকজন খুনী খুন করে পালাচ্ছে দুটো জলজ্ব্যান্ত মানুষকে ছিন্ন ভিন্ন করে। তাদের ডেরায় গিয়ে রিপোর্ট করছে। হয়ত তাদের নির্দেশদাতাকে ফোন করে বলছে, “খুন কইরা আইলাম, সাড়ে ৫ ইঞ্চি কোপাইসি”। সেই নির্দেশদাতা কি বলে তখন? মাশাল্লাহ? আল্লাহু আকবর? ওরা কি মৃত্যুর খবর শুনে সাপের মত হিঁস হিঁস শব্দে বলএ ওঠে, “দিসি আল্লাহর কাছে পাঠায়া”। এই যে নিহতদের মায়ের কান্না, ভাইয়ের কান্না, বোনের কান্না। কেমন লাগে এসব দেখতে? ওরা কি খুব আনন্দিত হয়?

অস্থির লাগে। বড় জানতে ইচ্ছে করে একজন খুনী খুন করে ঠিক তার পরে কি করে? কি খায়, কেমন করে তারা জীবন কাটায়…

Share.

About Author

Leave A Reply