Atheist in Bangladesh

থামছে না ব্লগার হত্যা

মুক্তমনা লেখক, ব্লগার হত্যাকান্ড- থামছেই না। সর্বশেষ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট নাজিমুদ্দিন সামাদকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনার প্রতিবাদে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ক্ষোভে ফুঁসছে। ব্লগারদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আতঙ্ক শুরু হয়েছে। একের পর এক হত্যাকা-ের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, এর আগে যেসব ব্লগার খুন হয়েছে তাদের খুনিরা আইনের আওতায় না আসা এবং অতি রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেই খুনের এ ঘটনা ঘটছে। খুনিদের নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে না পারলে এ অবস্থা চলতেই থাকবে বলে তাদের মত।জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নাজিমুদ্দিন সামাদের হত্যার ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, বাংলাদেশের কিছু ব্লগারকে আশ্রয় দেওয়ার বিষয়টি তাদের বিবেচনায় রয়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পেছনে আমবাগান গ্রামের একটি ফ্ল্যাটে থাকতেন ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আশরাফুল আলম। গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর বিকালে ওই ভাড়া বাসাতেই তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে এবং গলা কেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। আশরাফুল আলমকে হত্যার পর তাকে ‘আনসার আল ইসলাম বাংলাদেশ’ সংগঠনের ফেসবুক পেজে নাস্তিক, মুরতাদ আখ্যা দেওয়া হয়। গত বছরের ৭ আগস্ট রাজধানীর দক্ষিণ গোরানে দিনদুপুরে খুন হন নীলাদ্রি চ্যাটার্জী নীলয় নামে এক ব্লগার। আশরাফুলের পর গত ৩০ মার্চ ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান, ১২ মে সিলেটে ব্লগার অনন্ত দাশ বিজয়।গত বছর ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে বইমেলা থেকে ফেরার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় দুর্বৃত্তদের চাপাতির আঘাতে নিহত হন মুক্তমনা লেখক অভিজিৎ রায়। ওই ঘটনার পর এ পর্যন্ত কেবল উগ্রপন্থি ব্লগার ফারাবী শফিউর রহমানকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ফারাবী ফেসবুকে অভিজিৎকে হত্যার হুমকি দিয়ে লিখেছিলেন, বাংলাদেশে ফিরলে তাকে হত্যা করা হবে।
কিন্তু গ্রেপ্তারের পর ফারাবী অভিজিৎ হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেননি। অভিজিৎ যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হওয়ায় হত্যাকা-ের তদন্তে সহযোগিতা করছে সে দেশের তদন্ত সংস্থা এফবিআই।গত ৩০ মার্চ তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায় নিজ বাসার সামনে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয় ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান ওরফে বাবুকে। তিনি ফেসবুক ও অনলাইনে মুক্তমনা লেখালেখি করতেন। হত্যাকা-ের পরপরই জনতা ধাওয়া করে দুই হামলাকারীকে ধরে ফেলেন। তারা দুজনই মাদ্রাসার ছাত্র। অভিজিৎ হত্যাকা-ের এক মাসের মাথায় বাবুকে খুন করা হয়।

যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে গড়ে ওঠা গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী ছিলেন ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দার। শাহবাগ আন্দোলন শুরুর ১০ দিনের মধ্যে ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর পল্লবীতে বাসার সামনে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয় তাকে। হত্যাকা-ের ঘটনায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ তদন্ত শেষে ২০১৪ সালের ২৮ জানুয়ারি নর্থ সাউথের ৬ ছাত্রসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। জানা গেছে, এ ঘটনার প্রধান পরিকল্পক ছিলেন রেদোয়ানুল আজাদ রানা, কিন্তু এখন পর্যন্ত তাকে ধরা যায়নি।২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর দুপুরে লালমাটিয়ার শুদ্ধস্বরের কার্যালয় ও বিকালে শাহবাগে আজিজ সুপার মার্কেটের জাগৃতির কার্যালয়ে দুর্বৃত্তদের পৃথক হামলায় নিহত হন জাগৃতির প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপন। তবে গুরুতর আহত হলেও প্রাণে বেঁচে যান শুদ্ধস্বরের প্রকাশক আহমেদুর রশিদ টুটুল, লেখক ও ব্লগার রণদীপম বসু ও তারেক রহিম।র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান আমাদের সময়কে বলেন, বেশিরভাগ ব্লাগারের হত্যাকারীকে আটক করা হয়েছে। কয়েকটি মামলার অভিযোগপত্রও দেওয়া হয়েছে। অন্য মামলাগুলোও তদন্তাধীন। খুনিদের আইনের আওতায় আনতে র‌্যাব বদ্ধপরিকর।আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা বলছেন, অধিকাংশ ব্লগার খুনের ঘটনাতেই ক্ষুদ্রাস্ত্রের পরিবর্তে খুনিচক্র ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করেছে।

ভিন্ন সময়ে ভিন্ন স্থানে এরা হামলার শিকার হলেও তাদের সবার ওপর হামলার ধরন ছিল একই রকমের। মূলত গলা থেকে দেহের ঊর্ধ্বভাগ অর্থাৎ মাথাই ছিল আক্রমণকারীদের লক্ষ্যবস্তু। এসব হত্যাকা-ে জেএমবি ও উগ্রপন্থি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সম্পৃক্ততার বিষয় বারবার উঠে আসছে।নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম সাখাওয়াত হোসেন আমাদের সময়কে বলেন, সঠিক তদন্ত হচ্ছে না? নাকি অতি রাজনীতিকরণের ফল? নাকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দক্ষতার অভাব? এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা সবচেয়ে জরুরি। সব মিলিয়ে এক ধরনের অস্বস্তিকর পরিবেশ বিরাজ করছে।তিনি বলেন, কোনো ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে সেটি জঙ্গিদের কাজ এটি বলা হচ্ছে কিসের ভিত্তিতে? কাজটি ওমুক করেছে এটি বলা সবচেয়ে সহজ। এসব বলে তদন্তে ব্যাঘাত ঘটানো হয়। নিরপেক্ষ তদন্তের কোনো বিকল্প নেই।ব্লগারদের নিরাপত্তায় গত বছর পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স ৬৪ জেলার এসপিসহ পুলিশের সব ইউনিটে ৬ দফা নির্দেশনা জারি করে।

এরই অংশ হিসেবে সব ইউনিটে স্পেশাল টাস্কফোর্স গ্রুপ গঠন করা হয়। ওই গ্রুপকে জঙ্গিবাদ উগ্রপন্থি ব্লগে লেখালেখির মাধ্যমে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত প্রদানকারীদের চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণে নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোয় নিয়মিত নিবিড় মনিটরিংয়ে রাখতে বলে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স। এছাড়া ব্লগারদের লেখা বিশ্লেষণ করত তাদের কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে নির্দেশ দেয়। পাশাপাশি প্রযোজ্য ক্ষেত্রে যে সব ব্লগার সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ধর্মীয় উনকানিমূলক লেখালেখি প্রকাশ বা প্রচার করবেন তাদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আইনি ব্যবস্থা নিতে বলে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স। এছাড়া প্রত্যেক জেলা ও মহানগরে সংশ্লিষ্ট অপারেশনাল ইউনিটের আওতাধীন এলাকায় ব্লগার, জঙ্গি ও উগ্রপন্থিদের চিহ্নিত করে তাদের গতিবিধির ওপর নজর রাখতে বলা হয়।এদিকে গত বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনে পররাষ্ট্র দপ্তরের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে উপ-মুখপাত্র মার্ক টোনার এক প্রশ্নে বলেন, চরম ঝুঁঁকির মধ্যে থাকা নির্দিষ্টসংখ্যক ব্লগারের জন্য এটি একটি বিকল্প হতে পারে, বিষয়টি বিবেচনায় আছে।একের পর এক জঙ্গি হামলা ও হুমকির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের মুক্তমনা ব্লগার, লেখকদের যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় দিতে সম্প্রতি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির কাছে সুপারিশ করে ইউএস কমিশন অন ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডম- ইউএসসিআইআরএফ।

ওই চিঠির প্রসঙ্গ তুলেই এক সাংবাদিক টোনারের কাছে জানতে চেয়েছিলেন- ব্লগারদের আশ্রয় দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে কোনো অগ্রগতি হয়েছে কিনা। টোনার বলেন, বিষয়টি হোমল্যান্ড সিকিউরিটি দপ্তরের আওতাধীন। এ বিষয়ে তার হাতে খুব বেশি তথ্য নেই।পররাষ্ট্র দপ্তরের উপ-মুখপাত্র ব্রিফিংয়ের শুরুতেই নাজিম হত্যার প্রসঙ্গ তোলেন। ২৭ বছর বয়সী নাজিমকে বুধবার রাতে ঢাকার সূত্রাপুরে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে ও গুলি চালিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।ব্লগার হত্যাকা-কে একটি ‘গুরুতর ঘটনা’ হিসেবে চিহ্নিত করে টোনার বলেন, সহিংস উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে কথা বলায় তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে। আমরা নাজিমের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাই। বাংলাদেশে যারা সহিংস উগ্রবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছেন, তাদের প্রতি আমাদের সমর্থন অব্যাহত থাকবে।টোনার বলেন, বাংলাদেশ স্বাধীন ও মুক্তমতের যে গৌরবময় ঐতিহ্যের অধিকারী, তা সহিংসতার কাছে পরাজিত হওয়ার নয়Ñ এটা নাজিমুদ্দিন জানতেন; বাংলাদেশের ইতিহাসও সেই সাক্ষ্য দেয়।সন্ত্রাসবাদ, সহিংস উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এবং এ ধরনের নৃশংসতার সঙ্গে জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে সমর্থন দিয়ে যাবে বলে পররাষ্ট্র দপ্তরের এই কর্মকর্তা জানান।জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নও সামাদ হত্যার নিন্দা জানিয়ে দোষীদের বিচারের মুখোমুখি করার আহ্বান জানিয়েছে।

Atheist in Bangladesh