Atheist in Bangladesh

ইসলাম ধর্মে নারীদের কোন স্বাধীনতা নেই

লিখেছেন – সিনথিয়া আরেফিনঃ আমি একজন নাস্তিক এবং ধর্মের প্রতি আমার সামান্যতম আগ্রহ না থাকলেও আমি বাংলাদেশে বড় হবার সুবাদে এখানে নারীদের জীবন যাপন প্রতি নিয়ত প্রত্যক্ষ করবার সুযোগ পেয়েছি। বাংলাদেশের নারীদের জীবন যাপন পদ্ধতি ও তাদের সামনে এগিয়ে যাবার পেছনে মূল রসদ হিসেবে আসলে কোন কোন নিয়ামক কাজ করে? এই ধরনের প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে কয়েকটি বিষয় কিন্তু আমাদের সামনে এসে হাজির হয়। সেগুলোকে আবার বৃহৎ কিংবা ছোট পরিসরে বিভাজন করা যায়। যেমন ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক, ট্র্যাডিশনাল।

কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায় যে বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে নারীদের জীবন-যাপন পদ্ধতি কি আসলেই ধর্মীয় কারনকে ছাপিয়ে সামাজিক, রাজনৈতিক কিংবা ট্র্যাডিশনাল কারনকে উত্তরণ করতে পারে? আমি অন্তত আমার বাংলাদেশে বেড়ে উঠবার প্রেক্ষিত বিবেচনা করে একটা কথাই বলব যে, না, সেটি কোনোভাবেই ধর্মীয় কারনকে ছাপিয়ে নয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে একজন নারীর মুখের ভাষা থেকে শুরু করে তার শারীরিক যে কোনো বিষয় আসলে ধর্ম দ্বারা প্রচন্ড ভাবেই প্রভাবিত। আর এই প্রভাব বিস্তার করার ক্ষেত্রে শুধু ধর্মের নানাবিধ ডাইমেনশনাল ব্যবহার খুব স্বাভাবিক ভাবেই এই পুরো অবস্থাকে আরো বেশী পরকালীয় লাভ-ক্ষতি-শাস্তি-পুরষ্কার এমন আকারে নিয়ে এসে নারীর মনে আতংকের কিংবা বাধ্যতার বীজ বপন করে দেয়।

আমাদের বাংলাদেশ যেহেতু মূলত ইসলামী চিন্তা ধারার ও মুসলমান অধ্যুষিত দেশ সেহেতু বাংলাদেশে নারীর স্বাধীনতার কথা বলতে গিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে ইসলাম ধর্মকে সামনে নিয়ে এসে আলোচনা করাটাই উত্তম বলে আমি মনে করি। আর এই আলোচনা শুরু করবার আগে বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে নারীর সামাজিক, রাজনৈতিক কিংবা ট্র্যাডিশনাল অবস্থানের কথা না বললেই নয়।

সামাজিক ভাবে নারীদের এই দেশটিতে বিবেচনা করা হয় নারী মানে হচ্ছে সন্তান লালন-পালন আর ঘরে বসে গেরস্থালী করবার একজন কর্মী হিসেবে। এই সমাজের যেই দেখবার ও ভাববার দৃষ্টি সেখানে নারীকে প্রথমেই বিবেচনা করা হয় নারী মানেই হচ্ছে সে ঘরে থাকবে, নারী মানেই সে ঘরের রান্না করবে, নারী মানেই সে ঘরে বেড়ে ওঠা বাচ্চাদের লালন ও পালন করবে।

এই যে এই সামাজিকতার কথা বলে একটি স্টেরিওটাইপ চিন্তার ফ্রেমে নারীকে আবদ্ধ করে রাখা হচ্ছে সেখানে কিন্তু ব্যাক্তি স্বাধীনতাকে পুরুষেরা নিজেদের মত করে দমিত করে করে নিজেদের মতটাকেই প্রধান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। যার মানে দাঁড়াচ্ছে নারীর জন্য ফ্রেম সেট যারা করে রেখেছে তারা পুরুষ এবং তারা সামাজিকতার ও একই সাথে এক অদ্ভুত আমদানীকৃত নারী সম্মানের দোহাই দিয়ে এমন একটা অবস্থার সৃষ্টি করেছে।

এই যে পুরুষই এইভাবে নিয়ম বানাচ্ছে এবং সেটিকে একটি সামাজিক নিয়ম হিসেবে প্রক্রিয়াজাত করে চালু করেছে সেখানে আদৌ কি একজন নারীর বলবার স্বাধীনতা ছিলো কিংবা ইনফ্যাক্ট এই ধরনের ধারা তৈরী করবার পুরো ব্যাপারটিতে নারীর অবস্থান কোথায়? উত্তর হচ্ছে নেই।

নারীকে কম শক্তিধর, দূর্বল, অকর্মণ্য, উপযোগীতাহীন হীন ভাবনার যে ন্যারেটিভ পুরুষেরা তৈরী করে রেখেছে সেটির স্থায়িত্ব আসলে আবার কোন ধারনার মাধ্যমে বলীয়ান হয়? এই ধারনাটির-ই নাম আসলে ধর্ম। আর বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এটি ইসলাম ধর্ম। পুরুষেরা যখন সামাজিক বিধি ও বিধান গুলো তৈরী করে সেগুলো শুধু নারীদের উপর চাপাবার জন্য সকল ব্যবস্থা সম্পন্ন করেন তখন সেগুলোকে হালাল করবার সহজ মাধ্যম হচ্ছে ধর্ম। যেমন মেয়েদের বাইরে গেলে আল্লহ গুনাহ দেবেন আর গুনাহ দিলে বেহেশতে যাওয়া যাবেনা কিংবা লজ্জাই নারীর ভুষন, বেহায়া মেয়েরা বেশতে যায়না ইত্যাদি।

উপরে ব্যবহার করা নানাবিধ ধর্মীয় বিধির একটা ব্যাপক প্রভাব রয়েছে আর এই কারনেই আমি বলছি যে সামাজিক প্রেক্ষিতের অবস্থান বিবেচনা কিংবা ট্র্যাডিশনাল বা প্রথা বিবেচ্য করেও ধর্মকে আলাদা করা যায়না। নারীকে আপাদমস্তক হিজাবে, বোরকাতে আবৃত করে দেয়া হয় নারীর পবিত্রতাকে রক্ষা করবার ধুয়ো তুলে। কিন্তু একজন নারী পুরো শরীর হিজাবে ঢেকে বা বোরকার ঢেকে কিভাবে পবিত্র হয় সেটা এই ধর্ম বেত্তারা বলেন না। কিন্তু এই বেত্তারাও নিজেদের শরীর ঢাকেন না, তাহলে কি তাদের পবিত্র হবার দরকার নেই?

সবচাইতে মজার ব্যাপার হচ্ছে যে অপবিত্র হয়ে যাবার কথা বলা হচ্ছে এইসব বোরকা বা হিজাব ছাড়া সেটা কাদের উদ্দিস্ট করে বলছে? একজন নারীর দিকে খারাপ দৃষ্টিতে কেউ তাকাতে পারে, তাকে জিনা করতে পারে এই ধরনের সম্ভাবনার খলনায়ক কারা? স্বাভাবিকভাবেই তা পুরুষ। অর্থ্যাৎ রাস্তায় বের হলে পুরুষেরা মহিলাদের দিকে তাকাবে কু দৃষ্টিতে সে কারনেই বোরকা পর।

কিন্তু কেউ একবারেও বল্লো না যে এই পুরুষেরাই কু দৃষ্টীতে তাকাবে আবার তারাই বোরকা পড়তে বলবে তারাই পবিত্রতার কথা বলবে কিন্তু এই পুরূষদের ঠিক করবার জন্য ইসলাম কি বলে? কেন সমাজের নিয়ম তাদের উপর বর্তায় না?

এইসব প্রশ্নে কিন্তু একেবারেই উত্তর নেই। উত্তর দেবার প্রয়োজনও অবশ্য পুরুষেরা মনে করে না। সমাজের মধ্যে তারাই প্রথা তৈরী করে, ধর্মের পয়গম্বরও তারা, তারাই নিয়ম বানায়, রাষ্ট্রযন্ত্রে তারাই দাপিয়ে বেড়ায় আবার তারাই সকল কিছু নিয়ন্ত্রণ করে। সুতরাং কোনো নিয়ম, প্রথা, রীতি-নীতি এসব কিছু পুরুষকে ছোঁয় না। এই যে ধর্মের অযুহাত তারা দেয় তাহলে কি আমরা একবার লক্ষ্য করতে পারি যে ইসলাম ধর্মেই সুনির্দিষ্ট ভাবে নারীদের কিভাবে গণ্য করা হয় কিংবা তাদের অধিকার কতটুকু?

আব্দুল্লাহ ইবনে আমরের (রা.) বর্ণনায়, নবী (সা.) বলেন, দুনিয়া হচ্ছে সম্পদ উপভোগের বস্তু। আর পুণ্যবতী স্ত্রীর চেয়ে অধিক উত্তম সম্পদ আর নেই। -ইবনে মাজাহ, ১৮৫৫নং হাদীস।

‘আমি জানি, আমি তাদের স্ত্রীদের ব্যাপারে কি মোহরানা ফরজ করেছি।’ -সূরা আহজাব, ৫০নং আয়াত।

পুরুষ বা নারী, যে কেউ বিশ্বাসী হয়ে সৎকর্ম করবে, তাকে আমি নিশ্চয়ই সুখী জীবন দান করব। -সূরা নাহল, ৯৭নং আয়াত।

উপরের এই আয়াত গুলো কিংবা হাদীসের বাণীগুলো নিয়ে আলোচনার ও প্রশ্নের সুযোগ রয়েছে। প্রথম প্রদত্ত হাদীসেই পরিষ্কারভাবেই দেখা যাচ্ছে কি করে নারীদের সম্পদের সাথে তুলনা করা হয়েছে। যেন নারী একটি বস্তু কিংবা নারী একটা ভোগের ব্যবস্থা বা মাধ্যম।

পূন্যবতী স্ত্রীর চাইতে অধিক উত্তম আর নেই। এর থেকে এত অপমানকর কথা নারীর জন্য আর কি হতে পারে? পূন্য নারীকে ভোগ করবে পুরুষ, পূণ্য নারী কে হবে কিংবা কে হবে না এটাও নির্ঢারণ করবে আবার পুরুষ। আর এই বাণীটি যিনি দিয়েছেন তিনিও একজন পুরুষ। তাহলে দুনিয়াতে একজন নারী কি শুধুই সম্পত্তির বস্তু হয়ে ভোগের টুলস হিসেবেই ব্যাবহৃত হয়ে থাকবে?

আবার পরবর্তী কোরান শরীফের আয়াতে বাণীটুকু এমনভাবে বলা হচ্ছে যেন নারীদের সেই মোহরানা জানবার কোনো অধিকার নেই। শুধু সেই তথাকথিত স্রষ্ঠা জানেন আর জানেন তার অনুসারী মোহাম্মদ।

আবার এই যে তার পরের আয়াতেই যে সুখী জীবনের লোভ দেখানো হচ্ছে সেটিও শর্ত সাপেক্ষ। বিশ্বাসী হতে হবে এবং তারপর সৎকর্ম। এখানে বিশ্বাসী হওয়াটা হচ্ছে অবশ্য পালনীয়। এইভাবে কাউকে বিশ্বাসী হতে শর্ত দিয়ে পরবর্তীতে সুখী জীবন দেখাবার যে গল্প সেটি দেখিয়েই পুরুষ নির্বিচারে করে যাচ্ছে অন্যায়। আবার সৎ কর্মের অসিহিৎ প্রদানকারী কোরানে কি বলা রয়েছে? বলা রয়েছে যে ইসলামে বহুগামীতাকেও শর্ত সাপেক্ষে অনুমোদন দেয়া হয়েছে পুরুষের জন্য।

ইসলাম একের অধিক স্ত্রী রাখা সমর্থন করে, যদি একজন ব্যক্তি প্রয়োজন বোধ করে। তবে এজন্য কিছু শর্ত আছে। যেমন শারীরিক ও আর্থিক সক্ষমতা, সকল স্ত্রীকে সম দৃষ্টিতে দেখা। ইসলাম যৌন স্বাধীনতা খর্ব করে নাই,ইসলামে শুধু বিধি নিষেধ আছে বিবাহ বহির্ভূত ভাবে যৌন সঙ্গী গ্রহন করার ক্ষেত্রে।

আমার কাছে অত্যন্ত আপত্তিকর লাগে সসব ধারনা গুলো কিংবা ব্যখ্যা গুলো। পুরো নারী জাতির সম্মান, তাদের স্বাধীনতার মধ্যে শুধু শেকল পরাবার উদ্দেশ্য ছাড়া এই অনুশাসন কিংবা রীতির আর কোনো উদ্দেশ্য থাকতে পারেনা।

আর সে কারনেই ধর্ম নারীর অধিকার দিতে ব্যার্থ। ধর্ম শুধু নারীকে তার সেবা দাস করে রাখতে পারলেই যেন বাঁচে। এ ছাড়া যেন আর তার কোনো কাজ নেই, কর্ম নেই।

একটা সমাজে, একটা রাষ্ট্রে কিভাবে নারী আর পুরুষের ভেতর এমন একটা ইম্ব্যালন্সিং প্রক্রিয়ায় বা পদ্ধতিতে উন্নতি সম্ভব। নারী আর পুরুষের মধ্যে এই ধর্মীয় বিভাজন কিংবা একটি শ্রেণীকে এইভাবে দাবিয়ে রেখে একটা পুরো মানব সভ্যতা কি করে এগিয়ে যেতে পারে, এই ব্যাপারটি আমার মাথায় কোনোদিন ঢোকেনি, ভবিষ্যতে কখনো ঢুকবে সে আশাবাদ আমি ব্যাক্তও করিনা। সুতরাং নারী স্বাধীনতা ও ক্ষমতায়নের প্রশ্নে ধর্ম একটা প্রধান বাঁধা এটি নিয়ে আমার দ্বিধা নেই।

ধর্ম পালন করে যদি কেউ শান্তি পায় তাতে আমার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু ধর্মকে কারো অধিকার খর্ব করবার সুচতুর হাতিয়ার বানানো, মৃত্যুর পরের জীবনের কথা বলে একজন নারীর জীবনকে খেলনার আদলে পরিণত করবার পুরো নোংরা রাস্তাগুলোকে আমাদের বন্ধ করতে হবে। নারীর মুক্তি না ঘটলে আমরা শুধু অন্ধকার থেকে অন্ধকারে তলিয়েই যেতে থাকব।

Atheist in Bangladesh