ইসলাম ধর্মের প্রধান দুইটি হাদিস গ্রন্থ বুখারী এবং মুসলিম শরীফে সহ আরো কয়েকটি হাদিস গ্রন্থে বর্ণিত রয়েছে যে, আল্লাহ পাক প্রতিদিনই রাতের একটি অংশে সাত আসমানের উপরে অবস্থিত তার সিংহাসন আরশ থেকে পৃথিবীর নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করেন বান্দাদের প্রার্থনা ভালভাবে শোনার উদ্দেশ্যে। এ থেকে বোঝা যায়, আল্লাহর আরশ থেকে তিনি বান্দাদের প্রার্থনা ঠিকঠাক শুনতে পান না, বা বান্দাদের প্রার্থনা ঠিকঠাক মত আরশ পর্যন্ত পৌঁঁছায় না। তাই এটি আল্লাহর বিশেষ একটি নেয়ামত যে, তিনি বান্দাদের একদম কাছাকাছি চলে আসেন যেন পরিষ্কারভাবে প্রার্থনা শুনতে পারেন এবং তাৎক্ষণিক প্রার্থনা কবুল করতে পারেন। স্বাভাবিকভাবেই বোঝা যায়, পৃথিবী থেকে মানুষের প্রার্থনা আল্লাহর আরশ পর্যন্ত পৌঁছাবার পদ্ধতিতে নানা গলদ রয়েছে। প্রার্থনাগুলো সেই পর্যন্ত পৌঁছাতেও অনেক সময় লেগে যায়। এই ত্রুটিগুলো সংশোধনের উদ্দেশ্যে, সেগুলো ঠিক করার জন্য তিনি রাতের বিশেষ সময়ে দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করে নিজেই চলে আসেন, প্রার্থনা ঠিকভাবে শোনার জন্য। আজকে আমাদের আলোচনা এই বিষয়ে। আশাকরি পাঠক মন দিয়ে আমাদের লেখাটি পড়বেন।
ধরা যাক, আমি দশতলা একটি বিল্ডিং এর দশতলাতেই থাকি। নিচের তলাতে যিনি থাকেন, তিনি রোজই আমাকে ডাকেন। কিন্তু, আমি শুধুমাত্র সন্ধ্যাবেলাতে দুই তলার বারান্দায় এসে বসে থাকি, তার ডাক শোনার জন্য। ভেবে বলুন তো এই কাজটি আমি কেন করতে যাবো? দশ তলার উপর থেকেই যদি আমি তাৎক্ষণিকভাবে এবং খুব পরিষ্কারভাবে কথাগুলো শুনি, তাহলে আর আমার দুই তলাতে এসে উনার কথা শোনার দরকার হতো না। দশ তলা থেকে পরিষ্কার শোনা যায় না বা বোঝা যায় না, এরকম হলেই আমি শুধুমাত্র দুই তলাতে নেমে তার কথা শোনা শুনবো।
অনেক সময় দেখবেন, অনেকে মোবাইল ফোনটির মাইক্রোফোনটি মুখের কাছে এনে তারপরে কথা বলে। বা হেডফোনে গান শোনে। মাইক্রোফোনটি মুখের কাছে এনে শুনলে ঐপাশ থেকে ভালভাবে কথা শোনা যায়। আবার হেডফোনে শোনার কারণ হচ্ছে, এতে খুব পরিষ্কার সাউন্ড শোনা যায়। এগুলো যেকোন যন্ত্রের সীমাবদ্ধতা। যন্ত্র মানুষের তৈরি এক একটি জিনিস। কিন্তু আল্লাহর কুদরতের তো কোন সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে না। তাহলে, আল্লাহ কেন আরশ থেকেই প্রার্থনা না শুনে, নিকটবর্তী আসমানে এসে শোনেন? পরিষ্কারভাবে শোনার জন্য?
বর্তমান সময়ে সাধারণভাবে বলতে পারি, সবচাইতে বেশি দ্রুতি হচ্ছে আলোর। SI এককের সংজ্ঞা অনুসারে আলোর দ্রুতি প্রতি সেকেন্ডে ২৯৯,৭৯২,৪৫৮ মিটার (বস্তুত এটা মিটারের আধুনিক সংজ্ঞা)। যদিও আলোর চাইতে বেশি গতিতে বিগ ব্যাংয়ের পরে মহাবিশ্বের প্রসারন ঘটেছিল, সেটি বাদ রেখে সাধারণ হিসেবেই যদি হিসেব করি, তাহলে কী হয়?
ধরে নিই, মানুষ পৃথিবীতে বসে প্রার্থনা করছে। যেই মূহুর্তে সে প্রার্থনাটি করছে, প্রায় আট মিনিট পরে সূর্যে অবস্থানকারী (তর্কের খাতিরে ধরে নিচ্ছি) কেউ বিষয়টি জানতে পারবে। কারণ, গড় দূরত্বে সূর্য থেকে আলো পৃথিবীতে আসতে ৮ মিনিট ১৯ সেকেন্ড সময় নেয়। আবার, পৃথিবী থেকে ‘এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি’ এর দূরত্ব ২৫ লক্ষ আলোকবর্ষ। এর অর্থ হচ্ছে, আমাদের এখান থেকে সবচাইতে বেশি দ্রুতির আলো এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির দিকে তাক করে মারলে, এন্ড্রোমিডার কেউ সেটি ২৫ লক্ষ বছর পরে দেখবে। ততদিনে আমরা মরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবো। মহাবিশ্ব তো আরো অনেক বিশাল, আরো অনেক বড়। এই মহাবিশ্বের বাইরে যদি আল্লাহ থাকেন, তার কাছে প্রার্থনা পৌঁছাতে তো আরো অনেক সময় লেগে যাওয়ার কথা। এই কারণেই কী কারো প্রার্থনা কবুল হয় না? দেখা যায়, প্রার্থনা আল্লাহর আরশে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সে বংশশুদ্ধ মরে ভুত হয়ে গেছে। তখন আর প্রার্থনা শুনে কী লাভ?
এই কারণেই কী আল্লাহ সময় বাঁচাতে নিকটবর্তী আসমানে চলে আসেন? বিষয়টি গোলমেলে। ইসলামি বিশ্বাস অনুসারে, আল্লাহ পাক সর্বময় নয়। ঈশ্বর সর্বত্র থাকেন এটি পৌত্তলিকদের ধারণা ছিল। তাদের বিশ্বাস ছিল, জগতের সকল বস্তু এবং প্রাণীই আসলে ঈশ্বরের অংশ এবং ঈশ্বর সর্বত্র ছড়িয়ে আছেন। ব্রিটিশ নৃবিজ্ঞানী ই.বি টাইলর সর্বপ্রাণবাদের (Animism) প্রবক্তা। তাঁর মতে আদিম ধর্মবিশ্বাসের এটি হলো প্রথম সোপান। ল্যাটিন ‘এ্যানিমা’ শব্দ থেকে ‘এ্যানিমিজম’ শব্দটি এসেছে। কিন্তু ইসলাম এর সাথে, আরো ভালভাবে বললে আব্রাহামিক ধর্মের সাথে এই ধারণা সরাসরি সাংঘর্ষিক। ইসলামের বিশ্বাস অনুসারে, আল্লাহ সৃষ্ট জগত থেকে আলাদা এবং বাইরে অবস্থান করেন। যেমন, একটি কুকুর বা শুকর আল্লাহর অংশ নয়। বা কোন মানুষও আল্লাহর অংশ নয়। সেগুলো আল্লাহর সৃষ্টি। সেগুলো থাকলেও আল্লাহর কিছু যায় আসে না, না থাকলেও আল্লাহর কিছুই যায় আসে না। এই বিষয়ে অনেকগুলো কোরআনের আয়াত এবং হাদিস রয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে, আল্লাহ সৃষ্টি জগতের ওপর নির্ভরশীল নয়। যদি এগুলো আল্লাহ পাকের অংশ হতো, তাহলে আল্লাহ পাক এই কথা কখনোই বলতেন না যে, এগুলোর থাকা না থাকা দিয়ে তার কিছু যায় আসে না। কারণ নিজের অংশ সবসময়ই টিকে থাকতে হবে, নইলে নিজের অস্তিত্বই খণ্ডিত হয়ে যাবে।
স্বাভাবিকভাবেই, যেকোন যুক্তিবাদী মানুষই এইসব শুনলে সর্বপ্রথম যা ভাববে, তা হচ্ছে, আল্লাহ সেই সময়ে নিকটবর্তী আসমানে নেমে আসলে আরশে তখন কে থাকে? আরশ নিশ্চয়ই সেই সময়ে খালি থাকে। কিন্তু পৃথিবী গোলাকার হওয়ায় আল্লাহর তো ফিরে যাওয়ার উপায় নেই। যেকোন সময়ই কোথাও না কোথাও রাত্রির ঐ বিশেষ সময়ইটি উপস্থিত হবে। আল্লাহরও চক্রাকারে ঘুরতে হবে, পৃথিবীর ঘুর্ণনের সাথে পাল্লা দিয়ে। তাহলে, আল্লাহ পাক তো পৃথিবীর নিকটবর্তী আসমানেই আটকে যাবেন। ইসলামের ইতিহাসে মুতাযিলা দার্শনিকগণ, যারা যুক্তি দিয়ে ধরম বিশ্লেষণ করতে চাইতেন, তারা এই নিয়ে সন্দেহ পোষণ করেন। তারা এই হাদিসের সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। কিন্তু এই হাদিস এতটাই বিশুদ্ধ যে, এই হাদিসকে ভুল বলা হলে একই সাথে অন্যান্য অনেক হাদিসকেই বাতিল করে দিতে হবে একইভাবে। তাই ইতিহাসে ইসলামের অসংখ্য আলেম সরাসরিই এই হাদিস নিয়ে বেশী মাথা না ঘামাতে পরামর্শ দিয়েছে। এই হাদিস নিয়ে বেশী চিন্তা করলে ইমান হারাবার আশঙ্কাও অনেকে ব্যক্ত করেছে। যা তাদের অক্ষমতা এবং অসহায়ত্বেরই প্রমাণ।
