Atheist in Bangladesh

বিষাক্ত জনশূন্য এলাকায় স্বাগত

করোনাভাইরাস মহামারির বিস্তারের হাত ধরে আদর্শিক ভাইরাসের মহামারিও ছড়াচ্ছে ব্যাপক হারে—ভুয়া খবর, গোঁজামিলে ভর্তি ষড়যন্ত্রতত্ত্ব, বর্ণবাদের বিস্ফোরণ—এগুলো অবশ্য আমাদের সমাজে সুপ্ত অবস্থাতেই ছিল। সীমান্তরেখাকে পরিচ্ছন্ন করতে এবং পরিচয়ের জন্য হুমকিস্বরূপ শত্রুদের সঙ্গনিরোধে পাঠিয়ে দিতে আদর্শিক চাপের ভেতর পড়ে গেল সুচিকিৎসা, অথচ এটি দরকার সঙ্গনিরোধে যাঁরা আছেন, তাঁদের জন্য।

হয়তো অন্য কোনো আরও হিতকর আদর্শিক ভাইরাস ছড়াবে এবং আশা রাখি সেগুলো আমাদের সংক্রমিত করবে: বিকল্প সমাজভাবনার ভাইরাস, এমন এক সমাজ, যা জাতি-রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বে; এমন এক সমাজ, যা বৈশ্বিক সংহতি ও সহযোগিতার আদলে নিজেকে গড়ে তুলবে।

ব্যাপক হারে জল্পনা চলছে করোনাভাইরাস চীনের কমিউনিস্ট শাসনের পতন ঘটাতে পারে, গর্বাচেভ যেমন করে স্বীকার করে নিয়েছিলেন, চেরনোবিল বিপর্যয়ের মধ্য দিয়েই সোভিয়েত সাম্যবাদের পরিসমাপ্তি ঘটেছিল। কিন্তু এখানে আপাত-স্ববিরোধী মনে হলেও একটি সত্য আছে, তা হলো: জনগণ ও বিজ্ঞানের ওপর আস্থার ভিত্তিতে করোনাভাইরাসই কিন্তু কমিউনিজমকে পুনরাবিষ্কার করতে আমাদের বাধ্য করবে।

কুয়েনটিন টারান্টিনোর ‘কিল বিল: ভলিউড ২’ ছবির শেষ দৃশ্যে বিয়াট্রিক্স খল বিলকে অকেজো করে দেয় আর যেকোনো মার্শাল আর্টের সবচেয়ে মারাত্মক আঘাত ‘হাতের পাঁচ ঘায়ে হৃৎপিণ্ড ফাটানোর কৌশল’ দিয়ে তাকে আঘাত করে। এই কৌশলে আঙুলের ডগা দিয়ে সমন্বিতভাবে লক্ষ্যবস্তুর শরীরের পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন রক্তচাপের জায়গায় আঘাত করা হয়—লক্ষ্যবস্তু যখন আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে হেঁটে চলে যেতে থাকবে, তখন পাঁচ কদম চলার পরই তার শরীরের ভেতর হৃৎপিণ্ড ফেটে যাবে এবং সে মাটিতে লুটিয়ে পড়বে। এ ধরনের আক্রমণ মার্শাল আর্টের পুরাণকথায় পাওয়া যায়, কিন্তু সত্যিকারের মল্লযুদ্ধে এ অসম্ভব। তবে চলচ্চিত্রে আমরা দেখি, বিয়াট্রিক্সের ও রকম আঘাতের পর বিল উল্টো হামলা বন্ধ করে শান্ত হয়ে যায়, উঠে পাঁচ কদম হাঁটে এবং পড়ে মরে যায়।

এই মারামারিটি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে আঘাত করা ও মরে যাওয়ার মধ্যবর্তী সময়ের জন্য: আমি যতক্ষণ খুশি শান্ত হয়ে বসে চমৎকার আলাপ চালিয়ে যেতে পারি, কিন্তু সেটা যতক্ষণ আমি বসে আছি, আমি জানি, যখনই আমি হাঁটা শুরু করব, আমার হৃৎপিণ্ড ফেটে যাবে। চীনের কমিউনিস্ট সরকারের ওপর করোনাভাইরাস মহামারি একধরনের সামাজিক ‘হাতের পাঁচ ঘায়ে হৃৎপিণ্ড ফাটানোর কৌশলে’র মতো কাজ করবে, এমনটা তাঁরাও ভাবছেন না, যাঁরা জল্পনা করছেন—করোনাভাইরাস চীনের কমিউনিস্ট শাসনের পতন ঘটাতে পারে। তবে চীনের নেতৃত্ব বসে থাকতে পারে, তারা পর্যবেক্ষণ করবে এবং এরপর তারা স্বাভাবিক সঙ্গনিরোধের ভেতর দিয়ে সামনে এগোবে, কিন্তু সামাজিক স্তরে প্রত্যেক বাস্তব পরিবর্তন (যেমন সত্যিকার অর্থেই জনগণকে আস্থায় নেয়া) তাদের পতন ডেকে আনবে। আমার বিনয়ী মতামত এর চেয়েও বেশি আমূল সংস্কারবাদী: করোনাভাইরাস মহামারি হলো বৈশ্বিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ওপর এক ধরনের ‘হাতের পাঁচ ঘায়ে হৃৎপিণ্ড ফাটানোর কৌশল’—এটি একটি সংকেতও বটে, আমরা এখনো যে রাস্তায় হাঁটছি, তাতে আর হাঁটা যাবে না, আমাদের খোলনলচে পাল্টে ফেলতে হবে।

চলচ্চিত্রে মহাজাগতিক বিপর্যয়, যেমন কোনো গ্রহাণুর কারণে পৃথিবীর প্রাণীকূল হুমকির মুখে অথবা ভাইরাস গোটা মানবজাতিকে মুছে ফেলছে, এমন চলচ্চিত্রের কাল্পনিক সম্ভাবনার দিকে বছর কয়েক আগে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন ফ্রেডরিক জেমসন (ঞ)। বিশ্বের ওপর এমন হুমকি সর্বজনীন সংহতির জন্ম দেয়, আমাদের ছোটখাটো পার্থক্য তখন তুচ্ছ হয়ে যায়, আমরা একসঙ্গে সমাধান খোঁজার কাজ করি—আর আমরা এখন সেই জায়গাতেই পৌঁছেছি, আমাদের বাস্তব জীবনে।

ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া এই দুর্ভোগ আমাদের ‘উদ্দেশ্য’কে কোনো না কোনোভাবে সাহায্য করছে বলে আমি যে ধর্ষকামীদের মতো উপভোগ করে কথাগুলো বলছি, তা নয়, বরং, দুঃখজনক বিষয়টি তুলে ধরতে চাইছি—আমরা যে সমাজে বাস করি, সেটির একেবারেই মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে পুনঃচিন্তা করতে আমাদের বিপর্যয়ের দরকার পড়ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হলো বৈশ্বিক সহযোগিতার জন্য প্রথম গড়া কোনো একটি অস্পষ্ট আদল, যেখান থেকে আমরা প্রথাগত আমলাতান্ত্রিক অর্থহীন কথাবার্তা নয়, পাচ্ছি আতঙ্কহীন যথাযথ সতর্কবার্তা। এ ধরনের সংস্থাগুলোর নির্বাহী ক্ষমতা আরও বাড়ানো দরকার। মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী বার্নি স্যান্ডার্স যখন যুক্তরাষ্ট্রে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার পক্ষে কথা বলার জন্য মশকরার শিকার হচ্ছেন, তখন করোনাভাইরাস মহামারি কি এই শিক্ষাই দিচ্ছে না যে বিষয়টি অতীব জরুরি? বিশ্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নেটওয়ার্ক তৈরির জন্য আমাদের এখনই কাজ শুরু করা উচিত?

করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টিকে হালকা করে দেখাতে ইরানের স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ইরাজ হারিরচি সংবাদ সম্মেলন করলেন, বললেন গণহারে সঙ্গনিরোধ নিষ্প্রয়োজন। একদিন পরই ছোট বিবৃতি দিয়ে জানানো হয়, তিনি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত এবং নিজেকে আলাদা করে ফেলেছেন (টেলিভিশনের সামনেও তাঁকে দুর্বল ও জ্বরাক্রান্ত মনে হচ্ছিল)। হারিরচি বিবৃতিতে বলেন, ‘এই ভাইরাস গণতান্ত্রিক এবং এটি গরিব ও ধনী, এমনকি রাষ্ট্রনায়ক ও সাধারণ নাগরিকের ভেতর কোনো ভেদাভেদ রাখে না।’১০ এ ক্ষেত্রে তিনি গভীর সত্য বলেছেন—আমরা সবাই একই নৌকায়। এই ঘটনার সবচেয়ে বৈপরীত্যের জায়গাটি চোখে না পড়ে যায় না, সেটি হলো যেটার কারণে আমরা আজ একত্রিত হয়েছি এবং বিশ্বজনীন সংহতি প্রকাশের জায়গায় পৌঁছেছি, সেটির কারণেই আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে কঠোরভাবে একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এড়িয়ে চলতে হচ্ছে, এমনকি স্বেচ্ছায় হতে হচ্ছে বিচ্ছিন্ন।

আমরা কিন্তু শুধু ভাইরাসজনিত হুমকি মোকাবিলা করছি, তা নয়—অন্য ধরনের বিপর্যয়ও ঘনিয়ে উঠছে দিগন্তে অথবা এতক্ষণে ঘনিয়ে উঠেছে: খরা, খরতাপ, ঘাতক ঝড়, এই তালিকা দীর্ঘ। এই সব কটি ক্ষেত্রেই আতঙ্কিত হওয়া কোনো সমাধান নয়, বরং একধরনের কার্যকারী বিশ্বজনীন সহযোগিতা প্রতিষ্ঠা করতে জরুরি ভিত্তিতে কষ্টসাধ্য কাজে নামতে হবে।

ভ্রম থেকে আমাদের প্রথমে মুক্ত হতে হবে, সম্প্রতি ভারত ভ্রমণের সময় ভ্রমটি ছড়িয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প—এই মহামারি দ্রুতই কেটে যাবে, এর অকেজো হওয়া পর্যন্ত আমাদের শুধু অপেক্ষা করতে হবে, এরপর জীবন আবার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসবে। চীন এরই মধ্যে এই মুহূর্তের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে: তাদের গণমাধ্যম ঘোষণা দিয়েছে যখন মহামারি শেষ হবে, তখন লোকজনকে শনি ও রোববারও কাজ করতে হবে পুষিয়ে নেওয়ার জন্য। এসব অতি সস্তা আশার বিপরীতে, এটা মেনে নেওয়াটা দরকারি যে হুমকি [করোনাভাইরাস] থাকছে: এমনকি ঢেউ সরে যাওয়ার পরও এটি নতুন করে আবার আসতে পারে, হয়তো আরও ভয়ানক হয়ে, ভিন্ন চেহারায়। ঘটনা হলো এরই মধ্যে আমাদের মধ্যে করোনাভাইরাস সংক্রমণে মারা যাননি, এমন রোগী আছেন, বলা হচ্ছে তাঁরা সেরে উঠেছেন, এবং তাঁরা পুনরায় সংক্রমিত হয়েছেন, এই লক্ষণটি শুভ নয়।

এ কারণেই আমরা ভবিষ্যতে দেখব, ভাইরাসজনিত মহামারি অন্য লোকজনের সঙ্গে এবং আমাদের চারপাশের বস্তুরাশির সঙ্গে একেবারে মৌলিক মিথস্ক্রিয়াকে প্রভাবিত করবে, এর ভেতর আমাদের নিজেদের দেহও থাকবে। পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রচুর নির্দেশনা থাকবে: (অদৃশ্য) নোংরা জিনিস স্পর্শ এড়িয়ে চলুন, আংটা ধরবেন না, গণশৌচাগার বা খোলা জায়গার বেঞ্চিতে বসবেন না, কোলাকুলি অথবা করমর্দন থেকে বিরত থাকুন…এবং বিশেষ করে সতর্ক থাকুন নিজের শরীর ও স্বতঃস্ফূর্ত অঙ্গভঙ্গি নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে: নাক খোঁটাবেন না বা চোখ ঘষবেন না—সংক্ষেপে বললে, নিজেকে নিয়ে খেলবেন না। কাজেই এটা শুধুমাত্র রাষ্ট্র বা অন্য সংস্থাগুলো নয়, যারা আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে চাইবে, আমাদেরও শিখতে হবে কী করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ করতে হয়! হয়তো একমাত্র ভার্চুয়াল বাস্তবতাকেই নিরাপদ বলে ধরা হবে, এবং খোলা স্থানে মুক্ত হয়ে ঘোরাঘুরির জন্য বরাদ্দ থাকবে অতিধনীদের মালিকানাধীন দীপগুলো।১১

কিন্তু এখানেও, ভার্চুয়াল বাস্তবতা ও ইন্টারনেটের স্তরে, আমাদের নিজেদের মনে করিয়ে দিতে হবে যে গত দশকে ‘ভাইরাস’ ও ‘ভাইরাল’ এই কথাগুলো বেশির ভাগ সময়েই ব্যবহৃত হতো ডিজিটাল ভাইরাসের বেলা, যে ভাইরাস আমাদের ওয়েব-স্পেসকে সংক্রমিত করত এবং ওটা নিয়ে আমরা চিন্তিত হতাম না, যতক্ষণ পর্যন্ত না সেটি ক্ষতিকর শক্তি (ধরুন, আমাদের ডেটা বা হার্ড ড্রাইভের ক্ষতি করে দিয়েছে) প্রদর্শন করছে। বর্তমানে দেখছি কথাগুলো মূল আক্ষরিক অর্থের দিকে বিপুলভাবে ফিরে আসছে। ভাইরাসজনিত সংক্রমণ হাতে হাত রেখে দুই মাত্রাতেই কাজ করছে: বাস্তব ও ভার্যু ্য়ালে।

আরেকটি অদ্ভুত ঘটনা আমরা দেখতে পাচ্ছি, তা হলো পুঁজিবাদী সর্বপ্রাণবাদের (capitalist animism) জয়ীর বেশে ফিরে আসা এবং সামাজিক বিষয়গুলোকে এমনভাবে সামাল দেওয়া হচ্ছে যেন বাজার অথবা অর্থনৈতিক পুঁজি কোনো জীবন্ত সত্তা। বড় বড় গণমাধ্যম পড়লে মনে হয়, লক্ষাধিক লোক যাঁরা এরই মধ্যে মারা গেছেন অথবা সামনে আরও মারা যাবেন, তাঁদের নিয়ে আমাদের ভাববার দরকার নেই, আমাদের আসলে চিন্তা করা উচিত ‘বাজার যে উদ্বেগ তৈরি করছে’—তা নিয়ে; করোনাভাইরাস সবচেয়ে বেশি বিরক্ত করছে বিশ্ববাজারের মসৃণভাবে চলতে থাকা কর্মকাণ্ডকে। এসব কি বৈশ্বিক অর্থনীতিকে জরুরি স্বীকৃতির দেওয়ার জন্য পরিষ্কার আলামত নয়—যে অর্থনীতি আর বাজার পদ্ধতির দয়ার ওপর টিকে থাকবে না? আমরা এখানে, নিশ্চিতভাবেই, পুরোনো জমানার কমিউনিজম নিয়ে কথা বলছি না, কথা বলছি একধরনের বৈশ্বিক সংস্থা নিয়ে, যা অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি করতে পারবে, পাশাপাশি যখন প্রয়োজন হবে, তখন সার্বভৌমত্বকেও সীমিত করে ফেলতে পারবে। যুদ্ধাবস্থায় এমনটা সম্ভব করে তুলতে পেরেছিল রাষ্ট্রগুলো, আর আমরা এখন কার্যতই চিকিৎসা যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।

Ref: prothom alo

Print Friendly, PDF & Email

কমল চন্দ্র দাশ