ধর্মের পর আমাদের শেষ করবে ছাত্রলীগের স্কুল পর্যায়ের রাজনীতি

0

লিখেছেনঃ মোঃ তোফায়েল হোসেন

বন্ধু আরিফুল ইসলাম বাংলা ছায়াছবি “ধর” এর একটা ডায়লগ সামনে নিয়ে এসেছেন। যেখানে প্রয়াত চিত্রনায়ক মান্না ডিপজলকে বলছে “ওস্তাদ দেশের তো গুয়া মারা সারা”। ডায়লগ টা শোভন নয় বটে কিন্তু সাধারণ সচেতন মানুষ নিজের অবচেতন মনেই এখন মনে করেন তাদের “গুয়া” মারা সারা হয়ে গেছে। কেন সাধারণ মানুষ এটা মনে করেন?

কারন, গতকাল একটা বিজ্ঞপ্তিতে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতারা স্কুল পর্যায়ে ছাত্রলীগের কমিটি করবার চূড়ান্ত নির্দেশ দিয়েছেন।

এতদন আমরা মনে করতাম ইসলাম ধর্মের মোল্লারা আর ধর্মান্ধ পান্ডারা আমাদের সমাজকে নষ্ট করেছে, আমাদের ধর্ম আমাদের নষ্ট করেছে এখন এর মধ্যে যুক্ত হয়েছে ছাত্রলীগের রাজনীতির মত ব্যবস্থা। যেটি ইসলাম ধর্মের চাইতেও খারাপ ও নিকৃষ্ট।

এই বিজ্ঞপ্তি জানতে পেরে দেশে এক ধরনের আতংক তৈরী হয়েছে। উৎকন্ঠা তৈরী হয়েছে। কিন্তু একইভাবে বাংলাদেশের অনেক মানুষের এতে করে আতংক তৈরী হয়নি। তাঁরা অবলীলায় বলছেন শিবির কিংবা ছাত্র ইউনিয়ন স্কুল পর্যায়ে প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে রাজনীতি চালু রাখতে পারলে, ছাত্রলীগ কেন করতে পারবেনা? তাঁরা তাদের এই প্রশ্নের সাথে সাথে এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতাকারী ব্যাক্তিদের প্রতিও প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলছেন- “ছাত্রলীগ শুনলে আপনাদের এত চুলকায় কেন?”

কেন এত চুলকায় কিংবা কেন এত উৎকন্ঠা এই প্রশ্ন যারা করেছেন তাদের ফেসবুকের দিকে তাকালে এক ধরনের শান্তি আসে। এদের কথা বার্তায় মনে হয় এরা বাংলাদেশে নয়, মনে হয় এক ইউটোপিয়ান জনপদে বসবাস করছেন পরম নিশ্চিন্তে। যেখানে ক্লেদ নেই, গ্লানি নেই, টেন্ডারবাজি নেই, গুম নেই, খুন নেই, ধর্ষন নেই।

এইসব সমর্থকেরা শুধু আমাদের কেন চুলকায়, এই প্রশ্ন করেই যে পরিত্রাণ দিচ্ছেন তা নয়। তাঁরা তাঁদের জ্ঞানের পুরোটুকু ঢেলে দিয়ে আমাদের এও জানাচ্ছেন যে, বঙ্গবন্ধু-ও তো স্কুল পর্যায়ে রাজনীতি করতেন।

এদের কথা বার্তা অনেকটা কাওয়ালী গানের মূল গায়কের সাথে থাকা একদল তালিবাজ সহ গায়কের মত। কাওয়ালী গাইতে গেলে যেমন মূল নায়ক গান গাইতে থাকেন এবং বাকি সহ শিল্পীরা তালিয়া বাজাতে থাকেন চোখ বন্ধ করে, ঠিক তেমন।

তবে পুরো আলোচনায় যে ব্যাপারটিতে খুব মজা পেয়েছি সেটি হচ্ছে ছাত্রলীগের এই সিদ্ধান্তের সমর্থকেরা তাঁদের কথার যুক্তি হিসেবে বার বার খুনে শিবিরকে আদর্শ হিসেবে সামনে নিয়ে এসেছে। যে পলিটিক্স অভ কনভেনিয়েন্স এর কথা আমরা সব সময় বলেছি এটা হচ্ছে সেই প্রকরণ। বিপদে পড়লে কিংবা প্রশ্নবানে কর্নার্ড হয়ে পড়লে শিবিরকেও উদাহরন হিসেবে টেনে আনা যায়।

একজন ছেলে বা মেয়ে তাঁর জীবনের শুরু থেকেই রাজনীতি সচেতন হবেন, এটাই তো আমাদের কাম্য ছিলো। আমরা সাধারণ মানুষ সব সময় স্বপ্ন দেখেছি যে একটি স্কুলে পড়ুয়া ছেলে বা মেয়ে একেবারে তাঁদের জীবনের প্রাথমিক পর্যায় থেকে আমাদের দেশের রাজনীতির গলি, ঘুপচি, ভালো মন্দ এসব সব বিষয়ে জানবেন বা জানার চেষ্টা করবেন। ছাত্রলীগের এমন সিদ্ধান্তের ফলে আমাদের তো আনন্দে গোটা পঞ্চাশেক বুকডন দিয়ে দেবার কথা ছিলো।

কিন্তু কেন আমরা এই বিজ্ঞপ্তি দেখে চুপসে গিয়েছি? আমরা এই বিজ্ঞপ্তি দেখে চুপসে গিয়েছি কারন, আমরা স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত এই সাড়ে চার দশকের ছাত্র রাজনীতি প্রত্যক্ষ করেছি, পাঠ করেছি ও চুলচেরা পর্যবেক্ষণ করেছি। আর এসব দেখে চালু থাকা রাজনীতির প্রতি আমরা আগ্রহ হারিয়েছি ও ঘৃণা করতে শিখেছি। গত ৪৫-৪৬ বছরে ছাত্র রাজনীতির যেই ধারা ও প্র্যাক্টিস সেটি দেখার পর ছাত্রলীগের এই বিজ্ঞপ্তি আতংক তৈরী করবেই। কেননা বাংলাদেশের ছাত্রলীগের রাজনীতি মানেই খুন, ধর্ষন, টেন্ডারবাজি, মারামারি, কাটাকাটি এগুলো।

আমরা গত ৪৫ বছরের ধারা যদি বাদ দিয়ে শুধু গত সাড়ে আট বছরে ছাত্রলীগের রাজনীতির দিকে তাকাই তাহলেও ভয়ে ও আতংকে চুপষে যেতে হয়।

খোদ ছাত্রলীগের প্রধান কিছুদিন আগেই বলেছেন “কুত্তার মত পিটামু”

আবার ওই একই ব্যাক্তি ইমরান এইচ সরকারের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছেন দেশে থাকলে তিনি শিক্ষামন্ত্রী নাহিদের বাসায় গিয়ে ইমরানকে চড় দেবেন।

কয়েকদিন আগেও খুব সম্ভবত পত্রিকায় দেখলাম ছাত্রলীগের কয়েক কর্মী কিভাবে ধর্ষন করেছে এক কিশোরীকে।

একই ঘটনা ছাত্রলীগের কর্মীরা ঘটিয়েছে ময়মনসিংহে, বাউফলে, পটুয়াখালিতে,ঢাকায়, খুলনায়, চুয়াডাঙ্গা সহ কত শত স্থানে তার ইয়ত্তা নেই।

ছাত্রলীগের এক কর্মী আরেক কর্মীকে নির্মম ভাবে কুপিয়েছে চট্রগ্রামে, ঢাকাতে। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি এগুলো তো নিত্য নৈমত্তিক ঘটনা ছাত্রলীগের জন্য।

ছাত্রলীগের এক মধ্যমনি টাইপ নেতা লন্ডনে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে, খুলে বসেছে সলিসিটর ফার্ম। কি করে এই অর্থ সে পেয়েছে, কিভাবে পেয়েছে, কি দিয়েছে এসবের কোনো উত্তর নেই। একজন ছাত্র কিভাবে লন্ডনে এসেই দুই দিনের মাথায় কোটি কোটি তাকা বিনিয়োগ করতে পারেন? সেটি কি করে সম্ভব?

এই যখন ছাত্র রাজনীতির ধারা বাংলাদেশে সেখানে স্কুল পর্যায়ে এইসব নোংরা দূর্গন্ধময় রাজনীতি ঢুকালে কি হতে পারে এটা খুব সহজেই বোধগম্য।

ক্লাস ওয়ান থেকে শুরু করে ইন্টারমিডিয়েট, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল প্রতিটি পরীক্ষায় প্রশ্ন পত্র ফাঁস করা হচ্ছে কোটি কোটি টাকার বিনিময়ে। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার কফিনে যখন নাহিদ সাহেব শেষ পেরেক ঠুকছেন ঠিক তখন ছাত্রলীগের রাজনীতি ঢুকাবার পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত।

ব্যাপারটা সেই গ্রাম্য শ্লোক এর মতন-

-মরারে মারস ক্যান?
-কারন, মরা লড়ে চড়ে…

মানে হচ্ছে যেই শিক্ষা ব্যবস্থাটা একেবারে মৃত পুরো প্রাথমিক পর্যায় থেকে সেটিতে শেষ লাথি দেবার সমস্ত আয়োজন হয়ে গেছে।

আজকে যদি ছাত্রলীগ সুস্থ ধারার রাজনীতি করত, আজকে যদি সবার কাছে তাদের গ্রহণ যোগ্যতা থাকত, যদি সবাই ছাত্রলীগ শুনলেই মনে করত, বাহ এরা তো অসাধারণ। করুক না রাজনীতি, তাহলে এত প্রশ্ন আসতই না। প্রশ্ন এখন আসছে কারন চলমান ছাত্রলীগের সন্ত্রাস যেখানে অপ্রতিরোধ্য সেখানে এই বাচ্চা বাচ্চা ছেলে মেয়েদের সন্ত্রাসী ও বেপোরোয়া হওয়াটা আপনি ঠেকাবেন কি করে?

চিন্তা করতেই আতংকে গা শিউরে উঠে। ক্লাস ফাইভের বা ফোরের বাচ্চা দলবল নিয়ে বের হোলো রাস্তায়। একে পেটালো, তাকে পেটালো। এদের কিছু বললেই তাদের বড় ছাত্রলীগ ভাইরা হাজির হবে। আমি কল্পনা করি ক্লাস এইটের ছাত্রলীগ কর্মী মোবাইলে বলছে, “অই চল ওরে কোপামু আইজকা” , “ওই চল ওই মাইয়াটারে উঠাইয়া নিয়া আসি”। এইসবই হবে। একটা পজিটিভ কথাও মাথায় আসে না।

একজন মাধ্যমিকের ছাত্র/ছাত্রীকে যদি রাজনীতি সচেতন বানাবার আসলেই ভালো উদ্দেশ্য এদের থেকে থাকে তাহলে বলব মাধ্যমিক পর্যায়ে এদের ভালো ভালো বই পড়তে আন্দোলন করুন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এদের ব্যাপক ভাবে জানান, আমাদের ইতিহাস এদের জানান। শিল্প, সাহিত্য, আন্তর্জাতিক রাজনীতির বই তাঁদের আস্তে আস্তে পড়তে দিন। আমাদের জাতীয় হিরো শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সম্পর্কে তাঁদের জ্ঞান দিন, প্রাচীন বাংলার ইতিহাস এদের জানান, ইউরোপের ইতিহাস, মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস এই সম্পর্কে ওদের বলেন। ওদের পড়তে দিন চিত্রকলা, চলচ্চিত্র,দর্শনের বই। তারা পড়ুক ল্যাটিন আমেরিকার রাজনীতি, তারা পড়ুক মুঘল আমলের রাজনীতি। পড়ুক। শুধু তাঁদের পড়তে দিন।

আর এইভাবেই ওরা বেছে নিতে পারবে সঠিক রাজনীতি, সঠিক জ্ঞান ও সঠিক দিক। রাজনীতি নয়, স্কুল পর্যায় থেকে গড়ে তুলতে হবে বই পড়বার আন্দোলন। পাঠ্য বইয়ের বাইরে পড়াশোনা করবার আন্দোলন।

কিন্তু রাজনীতি সচেতন করতে ছাত্রলীগের সিল নয়। তাঁরা জানবে ইন্ডিপেন্ডটলি। তাঁরা স্বাধীন ভাবে সিদ্ধান্ত নেবে। আর যারা প্রাক মুক্তিযুদ্ধ ছাত্রলীগ বা ছাত্র রাজনীতির স্মৃতি এখনও চোখ বন্ধ করে চুষে যাচ্ছেন তাদের প্রতি আমার কিছু বলার নেই। তাদের আমি এই জগতের কেউ মনেই করিনা। এরা অন্য জগতের এলিয়েন।

এরা “গুয়া” মারা খেয়ে সারা হয়ে পরম মমতায় বলে উঠবেন, আমাদেরই তো সন্তান। মারুক না…

Share.

About Author

Leave A Reply