Atheist in Bangladesh

সায়েম ওরফে কামিকাজির সাথে এক সন্ধ্যালাপ

আজকের এই বর্ষাস্নাত এই সন্ধ্যায় আমাদের সাথে আছেন অন্যতম আলোচিত/সমালোচিত ব্লগার সায়েমের সাথে, যিনি ব্লগে কামিকাজি নামে লেখালেখি করে থাকেন এবং নাস্তিক্যবাদী লেখার জন্যই অনলাইন জগতে সুপরিচিত এক ব্লগার। চলুন তাহলে দেরি না করে কথা বলি সায়েমের সাথে।

এআইবিঃ -কেমন আছেন?
সায়েমঃ ভাল আছি

এআইবিঃ -আপনার সম্পর্কে কিছু বলুন।
সায়েমঃ আমার নাম আবু সায়েম কনক। বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্লগে ”কামিকাজি” নামে লিখে থাকি। ব্লগিং এর সাথে জড়িত আছি ৪ বছর ধরে। sayem-logoবর্তমানে সুইডেনে বসবাস করছি।

এআইবিঃ – কোন কোন ব্লগে লেখেন?
সায়েমঃ আমার নিজস্ব ব্লগ (thekamikazeblog.wordpress.com) ছাড়াও সামহোয়্যারইনব্লগ, ইস্টিশন ব্লগ এবং ধর্মকারিতে লিখে থাকি। এছাড়াও বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপে লেখালেখি করে থাকি।

এআইবিঃ -আপনার লেখা ” রোজা নামক উৎসবের গোঁজামিল ” আর্টিকেল নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা সমালোচনা হচ্ছে। এই যে সমালোচনা হচ্ছে, এই ব্যাপারে আপনার কি বলার আছে?
সায়েমঃ দেখুন, আমি যখন কোন লেখা লেখি, সেই বিষয়ে যথেষ্ট পড়াশুনা করি। আমি নিজে কুরআন এবং হাদিস বহুবার পড়েছি, এবং ইসলামের ইতিহাস সম্পর্কে গবেষণা করেছি এবং করছি। রোজা একটি অগ্নি উপাসকদের অনুষ্ঠান যা পরবর্তীতে ইসলামে এসেছে, এমনকি বহু হাদিসেও এর প্রমান রয়েছে। সেই প্রেক্ষিতেই প্রমান সহকারে এই লেখাটি আমি লিখেছি। কিন্তু অনেক মুসলমান আমার এই লেখাটি সহজভাবে নিতে পারেনি এবং অনেক সমালোচনা এবং হুমকির স্বীকার হয়েছি। এছাড়াও আরো অন্যন্য লেখা নিয়েও অনেক সমালোচনা হয়েছে এবং হচ্ছে। সত্য সবসময় তিক্ত হয়, তার ফলপ্রসুতেই এত সমালোচনা।

এআইবিঃ -আপনার লেখার বিষয়গুলি অন্যন্য ব্লগারদের থেকে ভিন্ন এবং আপনার লেখা অনেক বেশি প্রমাননির্ভর। এর কারন কি?
সায়েমঃ আমি আগেই বলেছি, আমি ধর্ম নিয়ে অনেক পড়াশুনা করেছি এবং করছি। ধর্ম বিষয়টা আমার জন্য অনেক ইন্টারেস্টিং। কিভাবে মানুষের বিশ্বাসকে পুঁজি করে হাজার বছর ধরে ধর্মগুলি মানুষের ভিতরে অবস্থান করছে ভাবাই দুস্কর। যেহেতু আমি বিজ্ঞানে বিশ্বাস করি, সেহেতু ধর্মের সাথে বিজ্ঞানের যে সংঘর্ষ, সেটা তুলে ধরার চেষ্টা করি। এবং আমার প্রতিটি লেখায় যুক্তিযুক্ত প্রমান এবং রেফারেন্স থাকে যাতে আমার লেখার বিষয়টি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়। এবং আমি সবসময় টু দ্যা পয়েন্ট লেখার চেষ্টা করি যাতে বিষয়ের আসল উদ্দেশ্য মানুষ বুঝতে পারে। সেই কারনে আমার লেখা অনেক সাবলীল, পঠনযোগ্য এবং প্রমানভিত্তিক রাখার চেষ্টা করি।

এআইবিঃ – কাউন্সিল ফর এক্স মুসলিম (ব্রিটেন) থেকে আপনার ইন্টারভিউ নেওয়া হয়েছে। এবং সেটি ইউটিউবে প্রকাশ করা হয়েছে। ঘন্টাব্যাপী সেই ইন্টার্ভিউয়ে আপনি অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। ইন্টার্ভিউয়ে কি কি বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন?
সায়েমঃ হ্যাঁ, কাউন্সিল ফর এক্স মুসলিম ( ব্রিটেন ) থেকে দুটি ইন্টারভিউ নেওয়া হয়েছে। একই ইংরেজি আরেকটি বাংলায়। আসলে বাংলাদেশী ব্লগাররা সাধারনত ক্যামেরার সামনে আসতে চান না, নিরাপত্তার ভয়ে। যখন আমাকে ইন্টার্ভিউয়ের অনুরোধ জানানো হল, আমি সাথে সাথেই রাজি হয়ে গেলাম। কারন বর্তমানে বাংলাদেশে ব্লগারদের উপর যে হামলা হচ্ছে সেই বিষয়ে অনেকেই লেখালেখি করলেও সবার সামনে এসে সারা বিশ্বব্যাপী জানান দেওয়ার কাউকে প্রয়োজন ছিল। এবং আমি নিজের মুখমন্ডল দেখিয়েই সেই ইন্টারভিউ দিয়েছি এবং অনেকেই আমার ইন্টারভিউকে স্বাগতম জানিয়েছে।

আমি ইন্টার্ভিউয়ে বাংলাদেশে ব্লগারদের অবস্থান, হুমকি, সরকারের অবস্থান, ইসলামিক জঙ্গীদের উত্থান এবং তাদের শক্তিশালী অবস্থান এবং ব্লগারদের করনীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি।

এআইবিঃ -গত কয়েক বছরে তো কয়েকজন ব্লগার, প্রকাশক এবং সমকামী পত্রিকার সংগঠকদের নির্মমভাবে হত্যা করা হল। এই ব্যাপারে আপনার অভিমত কি?
সায়েমঃ বাংলাদেশে বর্তমানে লেখকরা অনেক হুমকির মধ্যে আছে, বাংলাদেশে কারো স্বাধীনভাবে কথা বলা অথবা লেখার অধিকার নাই। বাংলাদেশ গনতান্ত্রিকভাবে একটি সেক্যুলার রাস্ট্র হলেও বাস্তবিকভাবে একটি ইসলামী রাস্ট্রে পরিনত হয়েছে। নাস্তিক, অজ্ঞেয়বাদী অথবা অন্যন্য ধর্মাবলম্বীরা অনেক হুমকির সম্মুখীন। শুধুমাত্র ভিন্ন মতবাদের কারনেই যে কেউ খুন হয়ে যেতে পারে বাংলাদেশে। ব্লগে ধর্ম নিয়ে লেখালেখি করলেই আপনি জাতীয় শত্রুতে পরিনত হবেন, এবং আপনি খুন হয়ে গেলে মানুষ সেটাকে স্বাভাবিকভাবেই নেবে এবং আপনার হত্যার বিচার কোনদিন হবে কিনা তা নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। বাংলাদেশে সমকামীরাও নিরাপদ নয় কারন ইসলাম ধর্মে সমকামীতা নিষিদ্ধ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সেই কারনে বাংলাদেশে যারা সমকামী আছে তারা নিজের পরিচয় প্রকাশ করতে চান না ভয়ে। দুঃখজনক হলেও সত্যি, বাংলাদেশে ইসলাম ধর্মের বাইরের কেউ নিরাপদ নয়।

এআইবিঃ -এইসব হত্যাকান্ডের পিছনে কারা জড়িত বলে মনে করেন?
সায়েমঃ আনসার আল ইসলাম নামক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এসব হত্যাকান্ডের দায় স্বীকার করেছে, এছাড়াও বাংলাদেশে অসংখ্য এরকম জঙ্গী সংস্থা আছে যারা ইসলামের নামে দেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে।

এআইবিঃ -বাংলাদেশের সরকার এখন পর্যন্ত কোন ব্যাবস্থা গ্রহন করেছে কি?
সায়েমঃ হাতে গোনা কয়েকজন খুনিকে গ্রেফতার করা হয়েছে, কিন্তু ওই পর্যন্তই। এইসব ইসলামিক জঙ্গিরা অনলাইনে বিশেষ করে ফেইসবুকে বিভিন্ন পেইজে ছবিসহ বিবরন দিয়ে হত্যার হুমকি দিচ্ছে, কিভাবে হত্যা করতে হবে তার টিউটোরিয়াল সহ। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে সরকার কাউকেই ধরতে পারছে না। সরকার উল্টো ব্লগারদের হুমকি দিয়েছে ধর্ম নিয়ে লেখালেখি না করার জন্য। ৫৭ ধারা জারি করা হয়েছে যদি কেউ ধর্মের বিরুদ্ধে লেখালেখি করে তাকে ১৪ বছরের জেল এবং ১ কোটি টাকা জরিমানা করা হবে। খোদ প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যদি কেউ ধর্মের বিরুদ্ধে লেখালেখি করে খুন হয় সরকার তার দায় নেবে না।

এআইবিঃ -বাংলাদেশে সেক্যুলার ব্লগিং এর ভবিষ্যৎ কি বলে আপনি মনে করেন?
সায়েমঃ বাংলাদেশে ব্লগাররা বর্তমানে অনেক হুমকিতে আছেন। অনেকেই দেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। যারা বাংলাদেশে আছেন তার নিজের নামে ব্লগিং করতে পারছেন না, ছদ্মনামে লেখালেখি করছেন। তারপরেও খুনিরা তাদেরকে ট্রেস করে খুন করছে। উদাহরন হিসেবে বলতে চাই, আহমেদ রাজিব হায়দার ” থাবাবাবা” নামে লিখতেন, নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় নিলয় ” নিলয় নীল ” ছদ্মনামে লিখতেন। কিন্তু খুনিরা তাদেরকে ফলো করে তাদের খুন করেছে। ব্লগাররা খুব সঙ্কিত অবস্থায় বাংলাদেশে বসবাস করছেন, কিন্তু তারপরেও তারা লেখালেখি চালিয়ে যাচ্ছেন। আশার কথা হল, অনেক নতুক লেখকরা আসছেন, ব্লগে লিখছেন এত হুমকি থাকা সত্ত্বেও। আমি আশা করি আরো নতুন লেখক আসবেন এবং লিখবেন ধর্মের গোঁড়ামির বিরুদ্ধে, লিখবেন সত্যের পক্ষে।

এআইবিঃ -আপনি কি ধর্ম নিয়ে লেখার কারনে কোন কটু মন্তব্য অথবা হুমকির স্বীকার হয়েছেন?
সায়েমঃ আমি প্রায় প্রতিনিয়তই আমার ফেসবুকে গালাগালি এবং হুমকি পাই। দেশে ফিরে গেলে আমাকে মেরে ফেলা হবে এমন হুমকিও আসে। আমি প্রথম প্রথম খুব একটা পাত্তা না দিলেও আমার পরিবারকে নিয়ে যথেষ্ট দুশ্চিন্তার মধ্যে থাকি। আমি বাইরে থাকি তাই আমি হয়ত নিরাপদ কিন্তু আমার কারনে যদি আমার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সেটা খুবই দুঃখজনক। আমার পরিবার ইতিমধ্যে কয়েকবার হুমকির সম্মুখীন হয়েছে, থানায় জিডি করতে গেলেও পুলিশ জিডি গ্রহন করতে অপারগতা প্রকাশ করে এবং আমাকে দেশে ফিরে না যাওয়ার পরামর্শ দেয়।

আপনাকে অনেক ধন্যবাদ শত ব্যস্ততার মধ্যেও আমাদের সাথে সন্ধ্যালাপের জন্য। ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন, এই কামনা করে আপাতত বিদায় নিচ্ছি, ভবিষ্যতে আবারো কথা হবে।

Athiest in Bangladesh